সুকুক: শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা

প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে ইসলামী অর্থায়নের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উপকরণ হলো সুকুক। সাধারণভাবে সুকুককে অনেকে ‘ইসলামী বন্ড’ বলে থাকেন। তবে বাস্তবে সুকুক প্রচলিত বন্ডের সরাসরি অনুবাদ নয়; বরং এটি সম্পদভিত্তিক, শরিয়াহসম্মত এবং অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগের একটি আধুনিক ব্যবস্থা।
প্রচলিত বন্ডে বিনিয়োগকারী মূলত সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ দেন এবং তার বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সুদ গ্রহণ করেন। ইসলামী শরিয়াহতে সুদ বা রিবা নিষিদ্ধ হওয়ায় মুসলিম বিনিয়োগকারীদের জন্য এ ধরনের বন্ড গ্রহণযোগ্য নয়। সুকুক এই সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়। এখানে বিনিয়োগকারী শুধু ঋণদাতা নন; বরং কোনো বাস্তব সম্পদ, প্রকল্প, সেবা বা ব্যবহার-অধিকারের অংশীদার হন। সেই সম্পদ বা প্রকল্প থেকে যে আয় হয়, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
সুকুকের মূল শক্তি হলো এর বাস্তব সম্পদের সঙ্গে সংযোগ। যেমন সরকার যদি কোনো পানি সরবরাহ প্রকল্প, সড়ক, সেতু, হাসপাতাল বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে চায়, তাহলে সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে জনগণ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নিতে পারে। এরপর প্রকল্পটি থেকে যে ভাড়া, আয় বা ব্যবহারমূল্য সৃষ্টি হয়, তা বিনিয়োগকারীদের রিটার্ন হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে অর্থায়ন শুধু কাগুজে ঋণ নয়, বরং বাস্তব উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
বাংলাদেশে সুকুকের ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সরকারের প্রথম সুকুক ইস্যু করা হয়েছিল নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পে অর্থায়নের উদ্দেশ্যে। এই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, দেশে শরিয়াহসম্মত নিরাপদ বিনিয়োগপত্রের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষের জন্য সুকুক একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ মাধ্যম হতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সুকুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মালয়েশিয়া সুকুক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দেশটির সরকারি ও করপোরেট খাতে সুকুক একটি প্রতিষ্ঠিত অর্থায়ন পদ্ধতি। ইন্দোনেশিয়া পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য গ্রিন সুকুক ইস্যু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশেও অবকাঠামো, জ্বালানি, আবাসন ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে সুকুক ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে সুকুকের সম্ভাবনা যত বড়, চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রথমত, সুকুকের কাঠামো সত্যিকার অর্থে শরিয়াহসম্মত হতে হবে। শুধু নাম সুকুক হলেই চলবে না; এর পেছনে বাস্তব সম্পদ, বৈধ আয় এবং ঝুঁকি-ভাগাভাগির নীতি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনগত কাঠামো শক্তিশালী না হলে বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরি হবে না। তৃতীয়ত, সুকুক কেনাবেচার জন্য কার্যকর সেকেন্ডারি বাজার দরকার, যাতে বিনিয়োগকারী প্রয়োজন হলে মেয়াদপূর্তির আগে সুকুক বিক্রি করতে পারেন।
বাংলাদেশের সামনে সুকুক ব্যবহারের বড় সুযোগ রয়েছে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সুকুক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি এটি ইসলামী পুঁজিবাজারকে গভীর করবে এবং বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
সব মিলিয়ে সুকুক শুধু একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি নৈতিক, সম্পদভিত্তিক এবং উন্নয়নমুখী অর্থায়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সঠিক নীতি, স্বচ্ছতা, শরিয়াহ তদারকি এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সুকুক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। জাতীয় উন্নয়ন ও শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ—দুই লক্ষ্য পূরণেই সুকুক হতে পারে আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
লেখক: শায়খুল হাদীছ ও বিভাগীয় প্রধান, জামিয়াতুল ইমাম মুসলিম রহ কক্সবাজার। সদস্য, শরীয়াহ সুপারভাইজারী কমিটি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি।




