চরিত্র গঠনের তিন মৌলিক স্তম্ভ

প্রতীকী ছবি
মানুষের চরিত্র কেবল নীতিকথায় গড়ে ওঠে না; চরিত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজন আদর্শ, দৃষ্টান্ত এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষা। সেই আদর্শের সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ রূপ হচ্ছেন মহানবী (সা.)। তাঁর প্রতিটি উচ্চারণ ছিল উম্মতের জন্য দিকনির্দেশনা, আর প্রতিটি নীরবতা ছিল গভীর শিক্ষা। এমনই এক অনুপম ঘোষণার ভেতর দিয়ে তিনি মানবচরিত্র গঠনের তিনটি মৌলিক স্তম্ভ আমাদের সামনে উন্মোচন করেছেন। সেগুলো হচ্ছে সংযম, আত্মমর্যাদা ও সবর।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত যে, কিছু সংখ্যক আনসারি সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি তাদের দিলেন। তারা আবার চাইলে তিনি আবারও দিলেন। এভাবে তার কাছে যা কিছু ছিল, সবই নিঃশেষ হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, ‘আমার নিকট যে মাল থাকে; তা তোমাদের না দিয়ে আমি জমা করে রাখি না। তবে যে ব্যক্তি চাওয়া থেকে বিরত থাকে; আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। আর যে পরমুখাপেক্ষী হয় না; আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে; আল্লাহ তাকে সবর দান করেন। আর সবরের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নিয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’(বুখারি, হাদিস : ১৪৬৯)
এই হাদিসটি শুধু একটি নৈতিক উপদেশ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক দর্শন, যেখানে ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার ভিত্তি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
প্রথম স্তম্ভ সংযম
নবীজি (সা.) প্রথমেই মানুষের অপ্রয়োজনে চাওয়ার মতো প্রবৃত্তির একটি সূক্ষ্ম দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। মানুষ অভাবে পড়লে সাহায্য চাইবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু চাওয়াকে অভ্যাসে পরিণত করা আত্মাকে দুর্বল করে দেয়। তাই রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চাওয়া থেকে বিরত থাকে; আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রাখেন।’
পবিত্র কোরআনুল কারিমেও এই আত্মসংযমের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘যারা মানুষের কাছে কিছু চায় না, অজ্ঞ ব্যক্তি তাদের স্বচ্ছল মনে করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৩) ইবন কাসীর (রহ.) বলেন, এই আয়াতে সেই সব মুমিনদের প্রশংসা করা হয়েছে, যারা অভাব সত্ত্বেও আত্মসম্মান রক্ষা করে এবং মানুষের সামনে হাত পাতে না (তাফসির ইবন কাসীর, ১/৭২৪)।
দ্বিতীয় স্তম্ভ আত্মমর্যাদা
হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে পরমুখাপেক্ষী না হয়; আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত করেন।’ এখানে অভাবমুক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং এটি মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক সমৃদ্ধির ঘোষণা।
রাসুল (সা.) অন্য হাদিসে বলেছেন- ‘প্রকৃত ধনী সে নয়, যার সম্পদ বেশি; বরং প্রকৃত ধনী সে, যার অন্তর সমৃদ্ধ।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৪৬) ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘এই হাদিস প্রমাণ করে, অন্তরের তৃপ্তি ও আত্মমর্যাদাই প্রকৃত সম্পদ; বাহ্যিক ধন তার বিকল্প হতে পারে না’ (শরহ সহিহ মুসলিম, ৭/১২৭)।
তৃতীয় স্তম্ভ সবর
হাদিসের শেষ অংশে নবীজি (সা.) যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা যেন চরিত্র দর্শনের চূড়ান্ত শিখর। ‘সবরের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নিয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’ সবর ইসলামে নিছক সহনশীলতা নয়; এটি একটি সক্রিয় ইবাদত। পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে অপরিমিতভাবে।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ১০)
আর অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘ঈমানের অর্ধেক হলো সবর এবং অপর অর্ধেক হলো শোকর’ (মাদারিজুস সালিকীন, ২/১৫২)।
উপরের আয়াত ও হাদিসগুলোর আলোকে স্পষ্ট হয় যে, মহানবী (সা.) ঘোষিত চরিত্র গঠনের তিনটি স্তম্ভ কোনো বিচ্ছিন্ন নৈতিক উপদেশ নয়; বরং এগুলো একটি পরিপূর্ণ ইসলামী জীবনদর্শনের ভিত্তি। সংযম মানুষকে লোভ থেকে রক্ষা করে, আত্মমর্যাদা তাকে মানুষের গোলাম হওয়া থেকে বাঁচায়, আর সবর তাকে আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখে।
আজকের ভোগবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজে এই তিনটি স্তম্ভই পারে মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তুলতে।
তাই আসুন আমরা সকলে নববী আদর্শের আলোকে জীবন পরিচালনা করার চেষ্ঠা করি। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



