যে সাহাবীর জানাযায় ফেরেশতারা অবতরণ করেছিলেন

প্রতীকী ছবি
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন ঈমান, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তাদের কেউ ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে সাহসী, কেউ ইলমের আলোয় পথপ্রদর্শক, আবার কেউ ছিলেন নীরব ইবাদত ও নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এমনই এক মহান সাহাবী হলেন সা‘দ ইবন মু‘আয (রা.), যাঁর মৃত্যুতে আকাশ-জগতও যেন শোকাহত হয়ে পড়েছিল।
তিনি ছিলেন আনসারদের নেতা, বদর ও উহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রধান সহযোগী। ইসলাম গ্রহণের পর তার জীবন সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ ও তার রাসুলের জন্য নিবেদিত হয়ে যায়। মদিনার সমাজে তিনি ন্যায়বিচার, নেতৃত্ব ও ঈমানের এক শক্ত প্রতীক ছিলেন।
তার মৃত্যুর ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদার সাক্ষ্য বহন করে। খন্দকের যুদ্ধে তিনি গুরুতর আহত হন। সেই আঘাতই পরবর্তীতে তার মৃত্যুর কারণ হয়। যখন তার ইন্তেকাল হলো, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তার জানাজা সম্পন্ন করেন এবং সাহাবাদের গভীর শোকাহত অবস্থায় রেখে তিনি বললেন, আকাশের দরজাগুলো তার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এবং তার জানাজায় ফেরেশতারা অংশগ্রহণ করেছে।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সা‘দের মৃত্যুতে আরশ কেঁপে উঠেছে এবং তার জানাজায় সত্তর হাজার ফেরেশতা উপস্থিত হয়েছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৮০৩)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই নেককার বান্দার জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৪৬৯)
এটি কোনো সাধারণ মর্যাদা নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান, যা খুব কম সাহাবীর ক্ষেত্রেই বর্ণিত হয়েছে। তার জীবনের আমল, ঈমানের দৃঢ়তা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্যই তাকে এই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে।
সা‘দ (রা.)-এর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার সত্যের প্রতি অবিচল থাকার দৃঢ়তা। তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি একবার সত্যকে গ্রহণ করার পর আর কখনো পিছপা হননি। ইসলামের জন্য তিনি নিজের গোত্র, পরিবার এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিলেন। তার এই আত্মত্যাগই তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মর্যাদা শুধু বংশ, সম্পদ বা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে ঈমান ও আমলের ওপর। সা‘দ ইবন মু‘আয (রা.)-এর জীবন এই সত্যের জীবন্ত প্রমাণ। তিনি ছিলেন সাধারণ এক ব্যক্তি, কিন্তু ঈমান তাঁকে আকাশের উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
আজকের সমাজে মানুষ মর্যাদা খোঁজে নাম, খ্যাতি, পদ ও সম্পদে। কিন্তু সা‘দ (রা.)-এর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত মর্যাদা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। একজন মানুষের জানাজায় ফেরেশতাদের উপস্থিতি কোনো পার্থিব অর্জনের ফল নয়; এটি ঈমান, তাকওয়া এবং নিষ্ঠার ফল।
সা‘দ (রা.)-এর মৃত্যু আমাদের শেখায়, একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন জীবন গড়া, যার সমাপ্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমতের মধ্যে হয়। এমন জীবন, যার জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে যায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, এনআকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।




