অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও ইবাদত

প্রতীকী ছবি
ইসলাম মানুষের ইবাদতকে শুধু মসজিদ কিংবা জায়নামাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, কারো কোনো প্রয়োজন মেটাতে সহযোগিতা করা কিংবা অসহায় মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে দেওয়াকেও ইসলাম অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে মূল্যায়ন করে। হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم السَّاعِي عَلٰى الأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللهِ أَوِ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ.
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘বিধবা ও মিসকিনের জন্য খাদ্য জোগাড় করতে চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের মতো অথবা রাতে সালাতে দাঁড়ানো ও দিনে সিয়াম পালনকারীর মতো।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৫৩) এই হাদিসে মহানবী (সা.) অসহায় মানুষের সেবাকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেননি; বরং এর সঙ্গে তুলনা করেছেন আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী এবং নিয়মিত নফল ইবাদতে নিয়োজিত ব্যক্তির। এতে বোঝা যায়, মানুষের প্রয়োজন পূরণে আন্তরিক প্রচেষ্টা ইসলামে কত বড় মর্যাদার কাজ।
বিধবা ও মিসকিন সমাজের এমন দুটি শ্রেণি, যাদের জীবনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্ব সহজেই নেমে আসতে পারে। স্বামীহারা একজন নারীকে অনেক সময় একাই সন্তান, সংসার ও জীবিকার দায়িত্ব বহন করতে হয়। অন্যদিকে মিসকিন এমন ব্যক্তি, যার প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু নিজের প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্য নেই। তাদের কষ্টকে উপেক্ষা করে একটি সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে মানবিক হতে পারে না।
পবিত্র কোরআনও অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে এবং বলে, আমরা তো শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাদের খাদ্য দান করি; তোমাদের কাছে আমরা কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।’ (সুরা ইনসান, আয়াত : ৮-৯) এখানে মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ সহযোগিতাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ মানুষের উপকার যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তখন তা নিছক সামাজিক সেবা না থেতে তা ইবাদতে পরিণত হয়।
এই হাদিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, শুধু সাহায্য করার ইচ্ছা যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন পূরণের জন্য চেষ্টা করাও সওয়াবের কাজ। ‘খাদ্য জোগাড় করতে চেষ্টারত ব্যক্তি’ কথাটির মধ্যে রয়েছে শ্রম, দায়িত্ববোধ ও উদ্যোগের শিক্ষা। কোনো বিধবা পরিবারের খাবারের সংকটে আছে, কোনো দরিদ্র ব্যক্তি সন্তানের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছে না, কোনো অসহায় পরিবার চিকিৎসা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সামর্থ্যবান ব্যক্তির উদ্যোগ নেওয়া ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বাস্তব প্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার কোনো একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯) অর্থাৎ মানুষের দুঃখ লাঘবের প্রতিদান শুধু দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রতিফলন আখিরাতেও পাওয়া যাবে।
তবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সম্মানবোধ অত্যন্ত জরুরি। সাহায্য করতে গিয়ে কাউকে অপমান করা, তার দুর্বলতাকে প্রকাশ করা কিংবা নিজের দানের প্রচার করা ইসলামের সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের দান-সদকাকে খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে নষ্ট করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬৪) তাই সাহায্যের হাত এমন হওয়া উচিত, যাতে অভাবী মানুষ সহায়তা পায়, কিন্তু তার আত্মমর্যাদা আহত না হয়।
আজকের সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, একাকিত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অসহায় মানুষের সংখ্যা কম নয়। এই বাস্তবতায় হাদিসটির শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো বিধবার মাসিক বাজারের দায়িত্ব নিতে পারে, কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে পারে, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে পারে কিংবা নিয়মিত কোনো অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারে।
আল্লাহর কাছে ইবাদতের মূল্য শুধু কতক্ষণ জায়নামাজে দাঁড়ালাম, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং মানুষের জন্য কতটা কল্যাণ বয়ে আনলাম, সেটিও ঈমানের সৌন্দর্যের পরিচয়। তাই অসহায় মানুষের কান্না থামানোর চেষ্টা, ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং বিধবার ঘরে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ একজন মুমিনের জীবনে এমন আমল হতে পারে, যার মর্যাদা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত উচ্চ। মানুষের প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো তাই কেবল মানবিকতা নয়, এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহৎ পথ।
লেখক: তরুণ আলেম






