যে রোজা কোনো উপকারে আসে না

প্রতীকী ছবি
রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের মাস। এ মাসে একজন মুমিন শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করেই দায়িত্ব শেষ করে না; বরং তার চোখ, কান, জিহ্বা, মন ও আচরণ— সবকিছুকে গুনাহ থেকে সংযত রাখার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক সময় রোজা কেবল খাদ্য ও পানীয় বর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে; অথচ চরিত্র ও আচরণে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এমন রোজা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর প্রকৃত সুফলও পাওয়া যায় না।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ করা এবং অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ পরিহার করল না, তার পানাহার বর্জনের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর কাছে নেই।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০৫৭)
এই হাদিস রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে। আল্লাহর কাছে রোজার মূল্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় নয়; বরং চরিত্রের পরিবর্তন, আত্মসংযম ও পাপ থেকে দূরে থাকার মধ্যেই এর আসল তাৎপর্য নিহিত।
পবিত্র কোরআনে রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
এ আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, রোজার লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন করা। আর তাকওয়া মানে শুধু ইবাদত করা নয়; বরং মিথ্যা, গীবত, প্রতারণা, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে দূরে রাখার নামই হচ্ছে তাকওয়া। কাজেই যদি রোজা কোনো মানুষের চরিত্রে পরিবর্তন না আনে, তবে সে ব্যক্তির রোজা তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও সতর্ক করে বলেছেন, ‘অনেক রোজাদার আছে, যারা তাদের রোজা থেকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পায় না ‘ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬৯০)
ইমাম গাজালি (রহ.) রোজার স্তর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, রোজার তিনটি স্তর রয়েছে: সাধারণ মানুষের রোজা, বিশেষ মানুষের রোজা এবং বিশেষদের বিশেষ রোজা। সাধারণ রোজা হলো শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকা। বিশেষ রোজা হলো চোখ, কান, জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে রক্ষা করা। আর সর্বোচ্চ স্তরের রোজা হলো অন্তরকে আল্লাহ ছাড়া সবকিছু থেকে বিরত রাখা। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন)
ইবনু রজব আল-হাম্বলি (রহ.) বলেন, রোজার মাধ্যমে মানুষের নফস দুর্বল হয় এবং গুনাহের প্রবণতা কমে। যদি রোজা সত্ত্বেও কেউ মিথ্যা, গীবত ও অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকে, তবে সে রোজার মূল উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত হয়। (লাতায়িফুল মা‘আরিফ)
বাস্তব জীবনে আমরা দেখি, কেউ রোজা রেখেও ব্যবসায় প্রতারণা করে, মিথ্যা বলে, অন্যের সম্মানহানি করে বা সামাজিক মাধ্যমে অপবাদ ছড়ায়। এসব আচরণ রোজার আত্মাকে নষ্ট করে দেয়। কারণ রোজা শুধু পেটের সংযম নয়, এটি চরিত্রের সংযম।
রমজান আমাদের শেখায়, রোজা হলো আত্মার প্রশিক্ষণ। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করে সংযমের শক্তি। সেই শক্তি যদি পাপ থেকে বিরত থাকতে ব্যবহার না করা হয়, তবে রোজা তার প্রকৃত ফল দিতে পারে না।
অতএব, আমাদের উচিত রোজাকে কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবে না দেখে, জীবন পরিবর্তনের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। জিহ্বাকে মিথ্যা ও গীবত থেকে, চোখকে হারাম দৃষ্টি থেকে, মনকে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে এবং হাতকে অন্যায় থেকে সংযত রাখতে পারলেই রোজা হবে পূর্ণাঙ্গ ও ফলপ্রসূ।
কারণ আল্লাহর কাছে সেই রোজাই মূল্যবান, যা মানুষকে ক্ষুধার্ত নয়, বরং পরিশুদ্ধ ও পরহেজগার বানায়। অন্যথায়, এমন রোজা আছে, যা কষ্ট দেয় ঠিকই, কিন্তু কোনো উপকারে আসে না।
লেখক: শিক্ষিকা, এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, নারায়ণগঞ্জ।

