আগামীর সময়

তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা হবে ছোট, কিন্তু কার্যকর

তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা হবে ছোট, কিন্তু কার্যকর

ফাইল ছবি

দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। দলের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, আসন্ন মন্ত্রিসভা হবে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি “ছোট কিন্তু কার্যকর” ক্যাবিনেট। স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা—এই তিন মানদণ্ডকে প্রাধান্য দিয়ে মন্ত্রী নির্বাচন করতে চান দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি আসন। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। এই জোট বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভায় কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে অভিজ্ঞ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে। বিএনপির প্রতিশ্রুতি অনুসারে, বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকেও সরকার পরিচালনায় যুক্ত করা হবে। নির্বাচনে জোটের যেসব নেতা বিজয়ী হয়েছেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হবে। টেকনোক্রেট কোটায়ও দল ও জোটের কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে, যাতে শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।

মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে দলীয় অঙ্গনে বিভিন্ন নাম আলোচনায় রয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। তবে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে, এমন আলোচনাও রয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও রাষ্ট্রপতি হওয়ার আলোচনায় রয়েছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এম হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও এ জেড এম জাহিদ হোসেনের মধ্যে দুই-একজন ছাড়া প্রায় সবাই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেতে যাচ্ছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান নির্বাচন করেননি, তাকে টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী করা হতে পারে। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে দুই-একজন স্পিকার হওয়ার আলোচনায়ও রয়েছেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও নির্বাচন করেননি। তাকে টেকনোক্রেট কোটায় তথ্য মন্ত্রণালয় অথবা গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

জোটের নেতাদের মধ্যে আন্দালিভ রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুরকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী ববি হাজ্জাজ ও ড. রেজা কিবরিয়াও আলোচনায় রয়েছেন।

বিএনপির নির্বাচিত নেতাদের মধ্যে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিতে পারেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু, শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, মনিরুল হক চৌধুরী, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মোঃ ফজলুর রহমান, আসাদুল হাবিব দুলু, জহির উদ্দিন স্বপন, আরিফুল হক চৌধুরী, খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, তাহসিনা রুশদির লুনা, আফরোজা খানম রিতা, ফজলুল হক মিলন, খায়রুল কবির খোকন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, মোঃ শরিফুল আলম, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, দীপেন দেওয়ান, শামা ওবায়েদ, শহিদুল ইসলাম বাবুল, মিয়া নুরুদ্দিন অপু, রকিবুল ইসলাম বকুল, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ আসাদুজ্জামান, শেখ ফরিদ আহমেদ, ফারজানা শারমীন, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মীর হেলাল, শেখ ফরিদুল আলম, নুরুল ইসলাম নয়ন, এস এম জাহাঙ্গীর এবং ইলেন ভুট্টো।

যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, হুমায়ুন কবির, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক ও দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবীনকে টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

দলের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিতর্কিত কাউকে মন্ত্রিসভায় রাখতে চান না বিএনপির প্রধান তারেক রহমান। মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে তিনি প্রত্যেকের অতীত দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। পরিচিত মুখগুলোর বাইরেও তিনি কাউকে কাউকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দিতে পারেন।

পরিবর্তনের প্রত্যাশা

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

বিজয়ের পর দলীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তনের প্রত্যাশা স্পষ্ট হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এটি জনগণের রায় এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কাজ করবে। তিনি বলেছেন, আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—অর্থনীতি সচল করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

নতুন সরকারের লক্ষ্য সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের লড়াই ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের। শহীদদের আকাঙ্ক্ষা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা একটি মেধা ও প্রযুক্তির্নিভর রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে চাই। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং ‘৩১ দফা’ অনুযায়ী সংবিধানের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার করা হবে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্বাধীনতার পর এই সংসদই হবে সবচেয়ে বেশি আইন প্রণয়নকারী এবং জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলক। নতুন সরকারের তিনটি মূল অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং দুর্নীতি নির্মূল করা।

    শেয়ার করুন: