সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডে সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা দেখছে বিরোধী দল

সংগৃহীত ছবি
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা জানার আগেই কেন তাদের রক্ষা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ায় সহায়তার উদ্যোগ নিতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার— এ প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের নেতারা। তাদের অভিযোগ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতি সচল থাকলেও বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় ঘাটতি রয়েছে। সৌদিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী নেতারা।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি সামনে আসে গত ১৫ অক্টোবর। সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১৪ অক্টোবর। সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের নাম নাজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং দণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তখনও বাংলাদেশের সরকারের কাছে স্পষ্ট ছিল না। বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনও আগাম অবহিত ছিল না বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেছেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের উচিত ছিল বিষয়টি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো। এ ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন দূতাবাসের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পেল না, সেটিও বোধগম্য নয়।
তিনি বলেছেন, ‘এখানে যথেষ্ট অবহেলা ছিল। আর সৌদি আরবের আইনের বিষয়ে তো আমরা কিছু বলতে পারব না। আমরা যেটা করতে পারতাম, তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে পারতাম, অ্যাপ্রোচ করতে পারতাম। তাহলে এটা এত দূর হয়তো গড়াত না। আমরা সে ধরনের তৎপরতা দেখাতে পারিনি, যেটা শ্রীলঙ্কাসহ অন্যরা পেরেছে।’
এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহ উদ্দিন সিফাতও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যারা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছেন, সেই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সরকার আগে থেকে কিছুই জানতে পারেনি এটি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেছেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের তথ্য আমরা আগে কেন জানলাম না? নিউজ হওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেনেছে। এ কারণেই যারা দায়িত্বে ছিল, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়েরও দায় রয়েছে। তাদের কাজ কি শুধু সরকার দলের লোকদের ম্যানপাওয়ার সাপ্লাই দেওয়া! এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। প্রবাসীরা এই সরকারের ওপর আস্থা হারিয়েছে।’
এদিকে সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি জানান, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বিচারিক রায়ের কপি চেয়েছে বাংলাদেশ। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৩ সালে অভিযুক্তদের আটক করে সৌদি আরবের পুলিশ। এ সময়ের মধ্যে তাদের পরিবারের কোনো সদস্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর তাদের পরিচয় এবং দুজনের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল, তা জানা যাবে বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সঠিক হলে তথ্য আদান-প্রদান ও প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কোথাও একটি ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নাগরিকদের কথা বলা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সৌদি আরবের আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে তথ্য আদান-প্রদান ও প্রক্রিয়ার জায়গায় যে ঘাটতির কথা সামনে এসেছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।



