অবহেলায় নদীতে আর কত প্রাণ বিসর্জন?

সংগৃহীত ছবি
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা হয়তো কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, ‘সাবধানে যাস বাবা’। সেই সাবধানতা আর কাজে আসেনি। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের’ চাকা যখন দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনে স্থির হওয়ার বদলে সামনের দিকে হঠাৎই দ্রুতবেগে ছুটতে শুরু করল, তখন বাসের ভেতরের ৫০ জনের বেশি যাত্রী হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি—এটাই তাদের শেষ যাত্রা।
মুহূর্তের মধ্যে বিশাল এক বাসকে গিলে খেল পদ্মা। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তীরের বালু ভিজে উঠতে শুরু করলো স্বজন হারানোদের চোখের নোনা জলে। কেন বারবার এই ফেরিঘাটগুলো প্রিয়জনদের কেড়ে নেয়? কেন পন্টুনগুলো নিরাপদ হওয়ার বদলে একেকটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে?
পদ্মার উত্তাল ঢেউ আর তীরের হাহাকার আজ মিলেমিশে একাকার। যেখানে প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকার কথা ছিল স্বজনদের, সেখানে আজ ঘাটের পাড়ে সারি সারি লাশের অপেক্ষা। বুধবার বিকেলে ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের’ বাসটি যখন মুহূর্তের মধ্যে অতল জলে তলিয়ে যায়, তখন বাসের ভেতর থাকা ৫০ প্রাণের শেষ আর্তনাদ হয়তো ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ইঞ্জিনের গর্জন আর পানির শব্দে। ঈদের আনন্দ নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার স্বপ্নটা কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রূপ নিল এক সলিল সমাধিতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পন্টুনের ঢালু পথ দিয়ে ওঠার সময় বাসটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করে এবং চোখের পলকে উল্টে পড়ে নদীতে তলিয়ে যায়। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও পানির গভীরতা ও তীব্র স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। রাত আটটা পর্যন্ত ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার হলেও তখন পযন্ত নিখোঁজ ছিলেন অন্তত ৪০ জন।
অন্যদিকে, বেলা ১১টার দিকে ৭ নম্বর ঘাটে তরমুজবাহী ট্রাকের হাইড্রোলিক ব্রেক ফেল করায় সেটিও নদীতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। পন্টুনের রেলিং না থাকলেও উঁচু এক অংশে আটকে গিয়ে প্রাণে বাঁচেন চালকসহ ৩ জন। এই দুটি ঘটনাই প্রমাণ করে, ফেরিঘাটের পন্টুন ও সংযোগ সড়কগুলো কতটা অনিরাপদ।
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে যানবাহন নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। ২০২১ সালের অক্টোবরে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে ফেরি আমানত শাহ ১৭টি ট্রাক নিয়ে কাত হয়ে ডুবে যায়। এই দুর্ঘটনায় সৌভাগ্যবশত কোনো প্রাণহানি না হলেও বিনষ্ট হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। একই বছরের নভেম্বরে দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুন থেকে নামার সময় পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে মৃত্যু হয় চালকের। পরের বছরের মে মাসে পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি থেকে নামার সময় প্রাইভেটকার নদীতে পড়ে নিহত হন ৩ জন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ঘন কুয়াশার মধ্যে ফেরি রজনীগন্ধা ট্রাক নিয়ে ডুবে যায় এই নৌপথের পাটুরিয়া প্রান্তে। সবশেষ গত ৫ বছরে এই নৌরুটে ছোট-বড় অন্তত ১২টি যানবাহন নদীতে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। যার মূল কারণ পন্টুনের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, অতিরিক্ত ঢালু রাস্তা এবং পন্টুনে কোনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা দেয়াল বা ব্যারিয়ার না থাকা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব পন্টুন এবং পন্টুনে উঠার পিচ্ছিল পথ যেনো হয়ে উঠে একেকটি মৃত্যুফাঁদ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এবং স্থানীয়দের মতে দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো হলো : ১. ত্রুটিপূর্ণ র্যাম্প ও বাইপাস: মূল সড়ক থেকে ফেরিতে ওঠার সংযোগ সড়কগুলো অত্যন্ত খাড়া এবং পিচ্ছিল। ২. নিরাপত্তা ব্যারিয়ারের অভাব : পন্টুনের দুই পাশে বা ফেরির মুখে কোনো মজবুত লোহার শিকল বা হাইড্রোলিক লক নেই যা যানবাহন পিছলে পড়া রোধ করতে পারে। ৩. ফিটনেসবিহীন যানবাহন : অনেক বাসের ইঞ্জিন ও ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল থাকায় ঢালু পথে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। ৪. লোডিং-আনলোডিংয়ে বিশৃঙ্খলা : ফেরিতে গাড়ি তোলার সময় দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মৃত্যুমিছিল থামাতে হলে শুধু শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন টেকসই সমাধান। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে : অটোমেটিক ব্যারিয়ার স্থাপন : প্রতিটি পন্টুন এবং ফেরির মুখে শক্তিশালী হাইড্রোলিক বা ম্যানুয়াল লক ব্যারিয়ার স্থাপন করতে হবে যাতে ব্রেক ফেল করলেও গাড়ি নদীতে না পড়ে।
ঢাল কমিয়ে আনা: সংযোগ সড়ক বা র্যাম্পের উচ্চতা ও ঢাল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কমিয়ে আনতে হবে যাতে বৃষ্টির দিনে বা পিচ্ছিল অবস্থায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ না হারায়। পন্টুন আধুনিকায়ন: পন্টুনগুলোকে আরো প্রশস্ত করতে হবে এবং দুই পাশে উঁচু কংক্রিট বা স্টিলের গার্ড রেইল বসাতে হবে। যানবাহনের ফিটনেস চেকে কঠোরতা : ফেরিঘাট এলাকায় প্রবেশের আগে যানবাহনের ব্রেক ও টায়ার পরীক্ষা করার জন্য মোবাইল টিমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উদ্ধারকারী সক্ষমতা বৃদ্ধি : ‘হামজা’ বা ‘রুস্তম’-এর মতো পুরনো উদ্ধারকারী জাহাজের বদলে আধুনিক এবং শক্তিশালী ক্রেন ও ডুবুরি দল সার্বক্ষণিক ঘাটে মোতায়েন রাখতে হবে।
দৌলতদিয়া ঘাটে স্বজন হারানোদের কান্না কি কেবলই নিয়তি? নাকি ব্যবস্থার অবহেলা? ৪৫টি প্রাণ যখন নদীর গভীরে তলিয়ে যাওয়া বাসের ঘোর অন্ধকারে আটকা পড়ে থাকে, তখন আমাদের পরিকাঠামোর আধুনিকায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। আমরা আর কোনো ‘হামজা’ জাহাজের দীর্ঘসূত্রিতা দেখতে চাই না, আমরা চাই নিরাপদ এক ফেরিঘাট, যেখানে ফেরিতে ওঠা মানে নিশ্চিত মৃত্যু ঝুঁকি নয়।

