আগামীর শিক্ষাক্রম কেমন হওয়া উচিত?

সংগৃহীত ছবি
সরকার আসবে সরকার যাবে। এটি গণতন্ত্রের রীতি। গত কয় বছরে বাংলাদেশ দেখেছে তিনটি সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম বাতিল করে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২১ চালু করে। নির্মোহ অনেক মতামত উপেক্ষা করে, অনেক যদি-কিন্তু রেখে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নতুন শিক্ষাক্রম জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের তড়িৎ সিদ্ধান্তে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের পুরনো শিক্ষাক্রম ফিরে আসে। এতে সাময়িকভাবে জনমনে স্বস্তি এলেও যুগোপযোগী নতুন শিক্ষাক্রমের চাহিদা থেকেই যায়। ১৮ মাস পরে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ভাবনায় মনোযোগ দেয়। আশা করা যায় ২০২৭ সালেই দেশ পাবে আরেকটি নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম। কেমন হওয়া প্রয়োজন আগামী দিনের শিক্ষাক্রম?
প্রয়োজন নতুন শিক্ষানীতি। নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখা প্রণয়নের পূর্বে শিক্ষার লক্ষ্য স্থির করা এবং পুরনো শিক্ষাক্রমের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। শিক্ষার সময়োপযোগী লক্ষ্য স্থির করতে জাতীয় শিক্ষানীতি নতুন করে প্রণয়ন করতে হবে। ১৫ বছর আগে নির্ধারিত শিক্ষার লক্ষ্য আর বর্তমানের লক্ষ্য এক হবে না। এর মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তি, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, শিল্প-প্রযুক্তি ও জব মার্কেটের অবস্থা বদলে গেছে অনেক। তাই শিক্ষার লক্ষ্য নতুন করে স্থির করতে হবে। সংগত কারণেই আগে নতুন শিক্ষানীতি এবং এরপর নতুন শিক্ষাক্রম তৈরিতে হাত দিতে হবে।
জানা থেকে পারাকে গুরুত্ব দিতে হবে। চাকরির বাজারে জ্ঞানী লোকের চেয়ে দক্ষ লোকের চাহিদা বেশি, বলা চলে উচ্চশিক্ষার সনদধারীর চেয়ে উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন মানুষের দরকার বেশি। মুখস্ত নির্ভরতার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাক্রমকে তাই সাজাতে হবে জীবনমুখী ও দক্ষতানির্ভর করে।
মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে। প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা পুরোপুরি জ্ঞানভিত্তিক। এই পদ্ধতি নোট/গাইড কিনতে এবং মুখস্ত করতে উৎসাহ দেয়। জিপিএ-৫ প্রাপ্তি প্রধান সাফল্য। তাই কোনো বাস্তব দক্ষতা অর্জন ছাড়াই শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করে। কাঙ্খিত দক্ষতার অভাবে শিক্ষিত বেকারের হার দিন দিন বাড়ছে। এমতাবস্থায় নতুন শিক্ষাক্রমে সাধারণ শিক্ষার মূল্যায়নে ৫০ ভাগ নম্বর বুদ্ধিবৃত্তিক ও ২৫ ভাগ দক্ষতাভিত্তিক ও বাকি ২৫ ভাগ ধারাবাহিক করা যেতে পারে। ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের সহপাঠ্যক্রমিক কাজের দক্ষতা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, জীবনবোধ ইত্যাদি পরিমাপ করা যেতে পারে।
হাতে-কলমে শিক্ষায় জোর দিতে হবে
বিদ্যমান ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, পলিটেকনিক, চিকিৎসা ও প্রকৌশল কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর ল্যাবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। ২৫ বছরের পুরনো মেশিন ও সরঞ্জাম নিয়ে গবেষণা করে কারখানা ও হাসপাতালে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির হাইব্রিড মেশিন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। দক্ষ ডাক্তার ও প্রকৌশলী পেতে অবশ্যই এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর মূল্যায়নে ‘জানা থেকে পারাকে’ বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ শিক্ষায় নবম শ্রেণি থেকে ব্যবহারিক ক্লাসগুলো নিয়মিত পরিচালনা করতে হবে। প্রতিটি ব্যবহারিক ক্লাসের শিখনফল অর্জিত হলো কিনা তা যাচাই করে শিক্ষার্থীদের নম্বর প্রদান করতে হবে।
ইংরেজি শিক্ষায় জোর দিতে হবে। সাধারণ ইংরেজি না জানায় বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকরা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদেরও প্রায় সকলের ইংরেজি ভাষায় আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ দক্ষতা নিম্ন থেকে মাঝারি মানের। ফলে তারা শীর্ষ পর্যায়ের পদে নিয়োগ পেতে ব্যর্থ হয়। ইংরেজি বিষয়ের মূল্যায়নে স্পিকিং, লিসনিং, রিডিং এবং রাইটিং এই চারটি দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আবেগীক শিখনে গুরুত্বারোপ করতে হবে। প্রচলিত শিক্ষা মানুষের মধ্যে সততা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারছে না। তাই নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের আবেগীয় শিখন ও এর মূল্যায়নে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ে জীবন-দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মূল্যবোধ চর্চার মতো পাঠ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের ‘আগডুম বাগডুম’ না শিখিয়ে সততা ও দায়িত্ববোধের চর্চা হয় এমন ছড়া শিখতে দিতে হবে। বাংলা বইতে এমন গল্প-কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যেগুলো পড়লে শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেম, সততা, পরোপকারে উৎসাহী হবে। সামাজিক বিজ্ঞানে এমন পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যা পাঠে শিক্ষার্থীরা দায়িত্ববোধসম্পন্ন, সুশৃঙ্খল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার প্রেরণা পায়।
দক্ষতায় নজর দিতে হবে। প্রচলিত শিক্ষার অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা পুরো শিক্ষাজীবনে কাঙ্খিত লাইফ স্কিল ও সফট স্কিলগুলো অর্জন করতে পারে না। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে উদ্ভূত নানা অভিনব সমস্যা সমাধানে হিমশিম খায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসমর্থ হয়। কথায় ও আচরণে তাদের বুদ্ধিদীপ্ত মনে হয় না; আত্মবিশ্বাসের অভাব পরিলক্ষিত হয়। পর্যাপ্ত বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও উচ্চতর চিন্তন দক্ষতার অভাব থাকায় এই সকল লোকজন চাকরি ক্ষেত্রে শীর্ষে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।
নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের পর তা বিস্তরণে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট রাখতে হবে। দক্ষ শিক্ষার্থী তৈরিতে দক্ষ শিক্ষক প্রয়োজন। পুরনো আমলের ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে থাকা শিক্ষক দিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যাবে না। তাই নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুরনো শিক্ষকদের নতুন তথ্য-প্রযুক্তি, শিক্ষানীতি, শিক্ষাক্রম, শিক্ষণ-শিখন, মূল্যায়ন বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষকের হাতে সর্বশেষ প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল তুলে দিতে হবে। ম্যানুয়েলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কারিকুলাম উল্লেখ থাকতে হবে, যা দেখে শিক্ষকগণ কোন পাঠ কীভাবে পরিচালনা করবেন, অর্জিত শিখনফল মূল্যায়নে কীরূপ প্রশ্ন করবেন, কিভাবে মূল্যায়ন করবেন তা জানতে পারেন। তবেই কার্যকর শিক্ষণ-শিখন সম্ভব হবে।
শেষের কথা
শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি এমনভাবে প্রণয়ন করা দরকার যা দেশে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বাস্তবায়নযোগ্য হয়। জন আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় এবং শিক্ষার্থীরা যাতে একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে প্রয়োজনীয় স্কিলগুলো (হার্ড স্কিল, সফট স্কিল ও লাইফ স্কিল) সফলভাবে অর্জন করতে পারে। তবেই শিক্ষার লক্ষ্য অর্জিত হবে।
লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গার্লস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ; পরীক্ষক, প্রশ্ন প্রণেতা ও পরিশোধনকারী, ঢাকা ও ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড; কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনকারী, টিচার্স কারিকুলাম গাইডের সহ-লেখক, এনসিটিবি
shofiqul78@gmail.com

