আগামীর সময়

শেষ বিকেলের যুদ্ধ

শেষ বিকেলের যুদ্ধ

কার্টুন: খলিল রহমান

রোজায় সাড়ে তিনটায় অফিস ছুটি। আমি সাড়ে চারটায় বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি বিরাট হট্টগোল। রাস্তায় দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে। উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসছে ১০-১৫ জনের একটি দল। একই সময়ে উল্টো দিক থেকে তেড়ে আসছে ২০-২৫ জনের আরেকটি দল। দেখে পুলকিত বোধ করলাম। দেশ ও জাতি খেলাধুলায় এগিয়ে যাচ্ছে ভেবে ভালো লাগল। আজকের খেলার নিয়মটাও সহজ মনে হলো। দূর থেকে বাস চোখে পড়লেই দৌড় স্টার্ট করতে হবে। তারপর ছুটতে হবে স্প্রিন্টের ক্ষিপ্র গতিতে। সবাইকে পেছনে ফেলে বাসে উঠতে পারলেই সফলতা। আপনি চ্যাম্পিয়ন। হয়ে যাবেন সফল নাগরিক। আর না পারলে হতে হবে বিশিষ্ট দার্শনিক! তখন বাস শুধু দেখেই যাবেন। গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন না কিছুতেই।

বাসের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় ঠেলাঠেলি হচ্ছে প্রচণ্ড। ব্যাপারটা ফ্রি স্টাইল কুস্তির সঙ্গে কিছুটা মিল পাচ্ছি। সবার মনে উৎকণ্ঠা। বাসায় পৌঁছতে পারবে তো? পরিবারের সঙ্গে ইফতার করা আনন্দের। আর এইটুকু আনন্দের জন্য করতে হবে মহাযুদ্ধ। ইফতারের আগে বাস সংকট প্রতিবছরের নিয়মিত ঘটনা। অফিসগুলো একই সময়ে ছুটি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে না। গন্তব্যে যাওয়ার কোনো বাহনই খুঁজে পাওয়া যায় না তখন।

আমি এক কোণায় বসে মানুষের দৌড়াদৌড়ি দেখতে লাগলাম। কী করব ভাবছি। বয়স হয়েছে। ডান পায়ের গোড়ালিতে ব্যথা আছে। আগের মতো দৌড়ানো সম্ভব হয় না। বাসের জন্য কুস্তি করার মানসিকতাও নেই। তবু দৌড় হয়তো এক সময় দিতেই হবে। সমাজ আমাকে বাধ্য করবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।

এক ভদ্রলোক দৌড়াতে দৌড়াতেই চিৎকার করছেন, ‘লাইন দেন ভাই, লাইন দেন! সবাই লাইন ধরে বাসে উঠেন। সিস্টেম তো মানতে হবে নাকি!’

কথাটা কেউ শুনল বলে মনে হয় না। তিনি নিজেই শুনলেন না। দৌড়াতে লাগলেন ঊর্ধ্বশ্বাসে। লাইনের ধারণাকে পেছনে ফেলে দুর্বার গতিতে সবার সামনে চলে গেলেন। আমাদের দেশে লাইনের ধারণা আছে কিন্তু লাইন নিজেই নেই। ঢাকায় এক সময় যাত্রীরা লাইন ধরে বাসে উঠত। টিকিট কেটে লাইন ধরাটাই ছিল তখন নিয়ম। এতে নারী, শিশু, বয়ষ্ক, অসুস্থ সবাই বাসে ওঠার সুযোগ পেত। বাসও বসে থাকত না। যাত্রী ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিত। অথচ সবকিছুই এখন অতীত।

আবার বাস এলো। এবারের ঠেলাঠেলিটা দেখলাম আরও ভয়াবহ। একজন বাসে উঠতে না পেরে নিচে পড়ে গেলেন। তিনি উঠে ধুলো ঝেড়ে আবার দৌড় দিলেন। দৃশ্য দেখে মনে হলো, জাতি হিসেবে আমরা কতটা আশাবাদী। পড়ে যাই, আবার উঠে দাঁড়াই। আমাদের লক্ষ্য স্থির ও অবিচল। সফলতা না আসা পর্যন্ত অদম্য গতিতে ছুটে চলি।

হঠাৎ মনে হলো, বাস না— মানুষ নিজেই আসলে সমস্যা। আমরা এত বেড়েছি যে বাসগুলো লজ্জা পাচ্ছে। আমি হিসাব করলাম। প্রতি বাসে প্রায় ৫০ জন বসার কথা। উঠছে মোটামুটি শ খানেক মানুষ। তারপরও ৫০ জন রয়ে যাচ্ছে বাইরে। এই ৫০ জনের মুখে একই অভিব্যক্তি— রাষ্ট্র আমাকে ঠকিয়েছে। রাষ্ট্র হয়তো বলবে ভিন্ন কথা— বাস তো আমি দিয়েছি, উঠতে না পারলে সেটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা।

এক ভদ্রলোক রাগে ফুসতে ফুসতে হুঙ্কার ছাড়লেন। সারাদিন রোজা রেখে কত ঝক্কি! মেজাজ কার ঠিক থাকে! ভদ্রলোক হাতের তর্জনী উঠিয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন, ‘প্রতিবছর এমন হয়। সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই। জনগণের কষ্টের কথা কেউ ভাবে না। তারা বড় বড় গাড়ি হাঁকায়, আর আমরা বাসে পিষ্ট হই। সময় এসেছে প্রতিরোধ গড়ার। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব মোকাবিলা করতে হবে। মাফিয়া চক্রের কালো হাত ...’

বক্তৃতা কেউ শুনল না। হঠাৎ একটা যাত্রী বোঝাই বাস এলো। তিল ধারণের জায়গা নেই তাতে। বাস থামল না। তবু সবাই দৌড়াল। বাস চলে গেল। সবাই থামল। এবারের দৃশ্যটা কোনো খেলার মতো লাগল না, কবিতার মতো হয়ে গেল। মানুষের জীবনটাও এমন। আমরা দৌড়াই, জীবন থামে না।

ইফতারের সময় ঘনিয়ে এসেছে। দৌড় কমল না, বরং বেড়েছে। এখন দৌড়ের সঙ্গে প্রার্থনাও যুক্ত হয়েছে। মুখে রোজা, মনে বাস। আমি এখন পর্যন্ত বাসে উঠতে পারিনি। পাশে আমার মতো আরেকজন ব্যর্থ প্রতিযোগী। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। হাসির অর্থ— আমরা হেরেছি এবং জেনেছি:

লাইন মানে তত্ত্ব।
দৌড় মানে বাস্তবতা।
আর বাস মানে সুযোগ।
—যা সবসময় সবার জন্য থামে না।

গোড়ালির ব্যথাটা টনটন করছে। তবু আমি উঠে দাঁড়ালাম। দৌড় দিতেই হবে। আরেকটা বাস আসছে। আমি দৌড়াই... জোরে জোরে দৌড়াই। বাসটা থামবে কিনা জানি না। কিন্তু এই শহরে না দৌড়ালে মানুষ হওয়াটাও কঠিন।

    শেয়ার করুন: