আতাউর রহমান : বাংলা নাটকের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি

সংগৃহীত ছবি
আতাউর রহমান পাড়ি দিলেন অনন্তলোকে। তিনি পরিণত বয়সেই চিরবিদায় নিলেন। তাঁর চিরবিদায় আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তৈরি করলো এক বিরাট শূন্যতা, যা কখনও পূরণ হবার নয়। তাঁর মত বিদ্বান, পণ্ডিত ও সফল নাট্য নির্দেশকের অভাব বাংলা নাট্যাঙ্গন অনুভব করবে প্রতিনিয়ত।
আতাউর রহমানকে আমি আতা ভাই ডাকতাম। আমি যখন গত শতকের আশির দশকের শেষদিকে ঢাকায় নাট্যচর্চা শুরু করি, তখন দোর্দণ্ড প্রতাপে ঢাকার মঞ্চে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় দীপ্যমান। সেই দলের প্রধান নাট্য নির্দেশক আতাউর রহমানের গ্যালিলিও, ঈর্ষা, মুখোশ, হিম্মতি মা দেখে আমরা বিস্ময়ে অভিভূত। এরই মধ্যে অভিনেতা হিসেবে তাঁকে দেখে নিয়েছি দেওয়ান গাজীর কিসসা, নূরলদীনের সারাজীবন নাটকে। পরবর্তীতে তাঁর নির্দেশিত ‘রক্তকরবী’ নাগরিকের আরেক মাইলফলক প্রযোজনা হিসেবে ইতিহাসে থাকবে। তখন আমাদের তরুণ বয়স, মহিলা সমিতির বারান্দায় দূর থেকে তাঁকে দেখতাম। দেশের অন্যতম প্রধান নাট্যদলের রাশভারী নির্দেশক হিসেবে তাঁকে শুধু সমীহ নয়, স্কুলের হেডমাস্টার স্যারের অনুভবে এড়িয়ে চলতাম।
আমি তখন ঢাকা পদাতিক ছেড়ে এস এম সোলায়মান ভাই’র নেতৃত্বে নতুন দল ‘অন্যদল নাট্য সম্প্রদায়’ গড়ে তুলছি। নতুন দলের প্রথম প্রযোজনা ‘আমিনা সুন্দরী’র একটি চরিত্রে টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রয়াত মজিবুর রহমান দিলু ভাই যুক্ত হলেন। দিলু ভাই আতা ভাই’র ছোট ভাই। আমাদের দ্বিতীয় প্রযোজনা ‘বুদ্ধি’র উদ্বোধনী প্রদর্শনী দেখার আমন্ত্রণ জানাতে দিলু ভাই’র পরামর্শে আতা ভাই’র বাসায় গেলাম। সম্ভবত ১৯৯০ সালে। বাসার দরোজায় সেটাই ছিল আতাউর রহমানের সাথে আমার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। একজন সামান্য নাট্যকর্মী হিসেবে তাঁর সাথে প্রথম নিবিড় কথা বলার সামান্য সুযোগ তৈরি হয়েছিল এই সাক্ষাতের বছর কয়েক পর সোলায়মান ভাই’র নাটক ‘স্বপ্ন দ্যাখো মানুষ’-এর প্রথম পাঠের দিন। ধানমণ্ডির অমনি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে আমদের মহড়াকক্ষে তিনি এলেন। ইতোমধ্যে তিনি দেখে নিয়েছেন আমাদের কোর্ট মার্শাল, গোলাপজান নাটক। তখন ‘অন্যদল’ থেকে আমরা ‘থিয়েটার আর্ট’ হয়ে গেছি। আমাদের নাটক দেখে তার মুগ্ধতার কথা বলেছেন সরাসরি, লিখেছেন পত্রিকার পাতায়। ‘স্বপ্ন দ্যাখো মানুষ’ নাটকের পাঠ নিমগ্ন হয়ে শুনলেন। তারপর দীর্ঘ আলোচনা করলেন। সেই প্রথম বুঝেছিলাম তিনি অকপটে কথা বলার মানুষ। ঢাকায় ২০০৫ সালে আমার প্রথম নির্দেশিত নাটক ‘সময়ের প্রয়োজনে’র উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে তিনি ও নাসিরউদ্দিন বাচ্চু বিশেষ অতিথি হিসেবে অভিনয় শেষে মঞ্চে উঠে শুভেচ্ছা বক্তৃতা করলেন, নাটকের নানা বিষয়ে আলোচনা করে প্রশংসা করলেন। সেই থেকে তিনি আমাকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতেন। দেখা হলেই কাছে ডেকে স্নেহের হাত পিঠে বুলিয়ে দিতেন। নানা সময়ে দেখেছি, তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা অসাধারণ। তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। পরবর্তীতে নানা বক্তৃতায় তাঁর বাগ্মীসত্তার পরিচয় পেয়েছি। যখন তখন তিনি রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়ার, বায়রন, শেলি থেকে উদ্ধৃতি দিতেন প্রাসঙ্গিকভাবে, আমরা তাঁর পড়াশুনার গভীরতা এবং সে পড়াশুনায় তাঁর আয়ত্ত দেখে বিস্মিত হতাম। আতা ভাই’র সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর অকপটতা, সারল্য আর প্রখর রসবোধ। তিনি ছিলেন শিশুর মত সরল। যা বিশ্বাস করতেন তা নিয়ে জোর গলায় বলতে তাঁর সামান্য বাধতো না। যা অপছন্দ করতেন, তা অবলীলায় মুখের উপর বলে দিতেন। তাঁকে তার যুক্তিতে অনড় থাকতে দেখেছি। তিনি অন্যের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, বয়সে ছোটো হলেও তাকে গুরুত্ব দিতেন। তাঁর শিল্পীসত্তার অহমবোধকে তিনি উর্ধ্বে তুলে ধরতেন। আতা ভাই ছিলেন প্রচণ্ডভাবে জীবনমুখী মানুষ। জীবন নিয়ে তাঁর দর্শন ছিল অস্তিত্ববাদী। তিনি জীবনকে পূর্ণ করতে চেয়েছেন সকল প্রাপ্তিতে। এবং সেদিক থেকে তিনি সার্থকও বটে।
শেষ করি তাঁর সাথে আমার ব্যক্তিগত একটি দীর্ঘ সফর নিয়ে। পশ্চিম বাংলার বহরমপুর কলাক্ষেত্রের একটি নাট্যোৎসবে তিনি উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হলেন। যোগসূত্রটা ছিল আমারই। সম্ভবত ২০১৩ সালে। তাঁকে ঢাকা থেকে বহরমপুর নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল আমারই। আয়োজকরা আমাকে সম্মান দিয়ে বিশেষ অতিথি করলেন। ঢাকা থেকে আকাশপথে কলকাতায় এবং কলকাতায় রাত্রিযাপন করে ট্রেনে বহরমপুর পৌঁছেছিলাম। কলকাতায় আমরা বিভাস চক্রবর্তীর সল্টলেকস্থ অন্য থিয়েটারে রাত্রিযাপন করলাম। বিভাস চক্রবর্তীর সাথে রাতে টেলিফোনে কথা বললাম দু’জনেই। তারপর মধ্যরাত অব্দি আতা ভাই আর আমি দীর্ঘক্ষণ আড্ডায় মেতে উঠলাম। সেইসময়ে পরিচয় পেয়েছি তাঁর জ্ঞান-গভীরতার। নানা বিষয় নিয়ে আলাপনের অসাধারণ সে অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তাঁর হালকা রসবোধে যেমন আপ্লুত হয়েছি, তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গের গভীর আলোচনায়ও ঋদ্ধ হয়েছি। বাংলাদেশের সমাজ রাজনীতি, বাংলাদেশের থিয়েটারের সংকট-সম্ভাবনা কোনোকিছুই বাদ যায় নি সে আলোচনায়। পরদিন ট্রেনে প্রায় ৫/৬ ঘণ্টার যাত্রা। বহরমপুরের অনুষ্ঠান শেষে আবার একইভাবে কলকাতায় ফিরে সদর স্ট্রিটের এক হোটেলে উঠলাম দু’জন। একরাত কাটিয়ে পরদিন তিনি ঢাকায় ফিরলেন। আমি কলকাতায় থেকে গেলাম আরও ক’দিনের জন্য। সেসময়েই পরিচয় পেয়েছি তাঁর রুচিবোধ আর আভিজাত্যের। তিনি ছিলেন দিলখোলা প্রাণবন্ত বন্ধুবৎসল একজন মানুষ। অবয়বে একটা মেকি গাম্ভীর্য ধরে রাখলেও আড্ডায় তিনি স্বভাবসিদ্ধ উদারতা আর উইটের মাধ্যমে সবাইকে জমিয়ে রাখতেন। তাঁর রসবোধ ছিল প্রখর।
আতা ভাই টেলিভিশন মাধ্যমেও অনেক অভিনয় করেছেন, জনপ্রিয়ও হয়েছেন। তবে নিজেকে তিনি ভালো অভিনেতা দাবী করতেন না, কিন্তু ভালো অভিনয়ের প্রশংসা করতেন উদারচিত্তে। মঞ্চে কারও ভালো অভিনয় দেখলে অকপটে প্রশংসা করতেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় বিশ্বনাটকের শুরুতে অভিনীত নাটকের মুখবন্ধ হিসেবে একসময় প্রয়াত সাঈদ আহমদ চমৎকার আলোচনা করতেন। পরবর্তীতে আতা ভাই এই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছেন।
বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ নাট্যদল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আতাউর রহমান। স্বাধীনতা উত্তর দর্শনীর বিনিময়ে প্রথম নাটক ‘বাকী ইতিহাস’-এর নির্দেশক হিসেবে ইতিহাসে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ কেন্দ্রের সভাপতি। নিজের নাট্যদলের বাইরেও অনেক নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন। পেয়েছেন একুশে পদকসহ জাতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে তিনি এক বর্ণাঢ্য জীবন যাপন করেছেন। তিনি নিজেকে বাংলাদেশ তথা বাংলা নাটকের একটি ইন্সটিটিউশনে পরিণত করেছিলেন। তাঁর মহাপ্রয়াণে বাংলাদেশের নাট্য ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো।
লেখক: নাট্য নির্দেশক ও অভিনেতা





