‘হানিমুন পিরিয়ডেই’ এদের সামলান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, পদায়ন বা বদলি নিয়ে ঘটছে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা। সাম্প্রতিক কিছু নিয়োগ ও পদায়ন জন্ম দিয়েছে চরম সমালোচনার। জনমনে প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনযন্ত্রে আসলে হচ্ছেটা কী? সমালোচনার মুখে কয়েকটি প্রজ্ঞাপন বাতিলও করতে হয়েছে। এসব অনিয়মের নেপথ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন এবং সরকারের ছায়ায় থাকা প্রভাবশালী এক সিন্ডিকেটের নাম শোনা যাচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা এতই প্রতাপশালী যে, কেউ তাদের ব্যাপারে মুখ খুলছে না। যেন সবার মুখে কুলুপ, চোখ বাঁধা কালো কাপড়ে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সরকারের এই ‘হানিমুন পিরিয়ডেই’এদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। এখনই লাগাম না টানলে এই ছোট লোভ একসময় বড় ডাকাতিতে রূপ নেবে, যা যা বিএনপি তথা বর্তমান সরকারের জন্য অশনিসংকেত।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য খাত বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগ-বদলি প্রক্রিয়া ঘিরে প্রভাব বিস্তার ও ঘুষ বাণিজ্যের খবর মিলছে প্রায়ই। নিয়োগ-পদায়নের এসব বিতর্ক প্রশাসনের ভেতরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারকে করছে প্রশ্নবিদ্ধ।
সাম্প্রতিক বড় কেলেঙ্কারিটি ঘটেছে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ নিয়ে। আ ক মো আশরাফুজ্জামান নামের এক ব্যক্তিকে এই পদে দেওয়া হয়েছে নিয়োগ। বিস্ময়কর তথ্য হলো, তার পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজতে গলদঘর্ম গোয়েন্দারাও। তার ক্যারিয়ার এমন যে, গুগুলে বহু তথ্য তালাশ করেও মিলছে না কোনো তথ্য। বিদ্যমান আইন ও প্রশাসনিক শিষ্টাচার ভেঙে, ইডিসিএল বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই জারি করা হয়েছে এই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন। এমনকি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীও এ বিষয়ে ছিলেন অন্ধকারে। আর পূর্ববর্তী এমডিকে অফিস ছাড়তে বাধ্য করতে রীতিমতো তৈরি করা হয় মব।
অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেও (ইউজিসি)। ইউজিসির সদস্য হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন ড. মামুন। অথচ তার বিরুদ্ধে খোদ ইউজিসির করা জার্নাল জালিয়াতির তদন্ত চলছে। এই নিয়োগের বিষয়েও শিক্ষামন্ত্রী কিছু জানেন না বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ। প্রশ্ন জাগে, গুরুত্বপূর্ণ এসব সিদ্ধান্তের দায় কি মন্ত্রীরা এড়াতে পারেন?
গত ১৯ মে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) থেকে পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় মোহাম্মদ মিজানুর রশীদকে। অথচ তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন ও শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে চলছে দুদকের অনুসন্ধান। তীব্র সমালোচনার মুখে সকালে জারি করা আদেশ বিকেলেই বাতিল করা হয়।
একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি নিয়োগে। গত ২৫ মার্চ শওকত মাহমুদের নিয়োগ আদেশ জারির পর বিতর্কের মুখে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে তা বাতিল করা হয়। এর একদিন আগে, ২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে বিতর্কিত ও বিগত ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা মো. আব্দুর রশিদ মিয়াকে দেওয়া হয় নিয়োগ। পরে এটিও বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রীও নাকি এই দুটি নিয়োগের বিষয়ে জানতেন না কিছুই। মন্ত্রীদের এড়িয়ে এই ভুতুরে নিয়োগগুলোর পেছনে যে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের লম্বা হাত রয়েছে, তা স্পষ্ট।
পদায়ন ও বদলি নিয়ে এই তোলপাড়ের মূল কারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অস্বচ্ছতা। যোগ্য কর্মকর্তারা হচ্ছেন বঞ্চিত। মোটা অঙ্কের অর্থ বা রাজনৈতিক তদবিরের জোরে অযোগ্যরা বসছেন গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে। এতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের মনোবল যাচ্ছে ভেঙে। মেধার চেয়ে অর্থ ও প্রভাব প্রাধান্য পেলে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্র ও সুশাসনের প্রতি হারিয়ে ফেলবে আস্থা।
নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটি গঠন, দুদকের অনুসন্ধান কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব অনিয়ম বন্ধে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হয়েছে? কেবল কয়েকজনকে নিয়োগ আদেশ বাতিল বা শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি পুরো প্রক্রিয়াই দুর্বল ও অস্বচ্ছ থেকে যায়।
সরকারি নিয়োগ ও পদায়ন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা জরুরি। লিখিত পরীক্ষা থেকে শুরু করে ফল প্রকাশ, মেধাতালিকা প্রস্তুত এবং পদায়ন—সব ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি চালু করা গেলে কমবে মানবিক হস্তক্ষেপ। একইসঙ্গে বদলি নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে, যাতে ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছা বা প্রভাবের কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত না হয়।
এছাড়া জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থাও প্রয়োজন। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, তাদের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি বাস্তবে কার্যকর করতে হলে নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়াকে রাখতে হবে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের বিশ্বাস রক্ষা করা। যদি মানুষ মনে করে সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য মেধা নয়, বরং অর্থ ও প্রভাবই মূল শক্তি, তাহলে সমাজে হতাশা ও বৈষম্য বাড়বে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়বে ন্যায়বিচারের ধারণা।
সরকারি প্রশাসন একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড যদি অনিয়ম, পক্ষপাত ও দুর্নীতিতে আক্রান্ত হয়, তাহলে উন্নয়ন ও সুশাসনের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নিয়োগ, পদায়ন ও বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
কেবল দু-একটি আদেশ বাতিল বা তাৎক্ষণিক শাস্তি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। পুরো ব্যবস্থাকে করতে হবে দুর্নীতিমুক্ত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সুবাদে উন্নত বিশ্বের প্রশাসনিক কাঠামো ও সুশাসন ব্যবস্থা আপনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন, সেটা আপনার কাজে-কর্মে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। আপনি জানেন, অযোগ্য ব্যক্তি দায়িত্বে এলে সেবার মান কমে এবং দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
আপনার চোখ খোলা, একই সাথে পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আপনার রয়েছে অনেক সংস্থাও। সেই চোখগুলোকে এক করে এই সিন্ডিকেটকে দ্রুত চিহ্নিত করুন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। মানুষ কর্মদোষে ক্ষমতা হারায়, আবার কর্মগুণেই মানুষের মনে অমর হয়ে থাকে। আপনি এমন একটি স্বচ্ছ রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করে দিয়ে যান, যা আপনাকে দেশবাসীর কাছে করে রাখবে চিরস্মরণীয়। বাংলার মানুষ আপনার চূড়ান্ত পদক্ষেপের অধীর অপেক্ষায়।
লেখক: ক্রাইম অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন অ্যাফেয়ার্স এডিটর, আগামীর সময়






