সাক্ষাৎকার
প্রবাসী শ্রমিকরা যেন শুধুই রেমিট্যান্স

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন শরিফুল হাসান। সম্প্রতি প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা, দক্ষ জনশক্তি তৈরির চ্যালেঞ্জ, মানব পাচার ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সার্বিক অভিবাসন সংকট নিয়ে ‘আগামীর সময়’-এর মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বখতিয়ার আবিদ চৌধুরী
আগামীর সময়: সম্প্রতি সৌদি আরবের রিয়াদে এক সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে ১৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হলো। এমন ঘটনা আরও বহুবার ঘটেছে...
শরিফুল হাসান: আমরা এখন ১৬ জন প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর খবর দেখছি। একসঙ্গে এতজন মারা গেছেন বলে সংখ্যাটা সবাইকে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু এটি অনেকেই খেয়াল করেন না, প্রতি বছর দেশে গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার শ্রমিকের লাশ আসে। এ হিসাবে গত ১৬-১৭ বছরে ৫০ হাজার প্রবাসীর লাশ দেশে এসেছে। সংখ্যাটা খেয়াল করুন— ৫০,০০০!
মারা যাওয়া এই শ্রমিকদের অনেকের বয়স আমরা দেখেছি যে ২৫ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। এত কম বয়সে কেন মারা যাচ্ছেন– তা অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলাম। তারা হয় মারা গেছেন দুর্ঘটনায়, নয়তো ব্রেইন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একেকজন শ্রমিক ১৮-২০ ঘণ্টা কাজ করেন। তার কারণ পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা খরচ করে তারা সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজ করতে যান। কেউ ধারদেনা করে, কেউ জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেন। এত কষ্ট করে গিয়েও মাসে গড়ে বেতন পান ২০ হাজার টাকা। দুই বছরে মেরেকেটে হয়তো পাঁচ লাখ টাকা হবে। যখন তিনি দেখেন পরিবারের চাহিদা তো দূর, যে টাকা খরচ করে গেছেন সেটিই তুলতে পারেননি, তখন এ টাকা তুলতে গিয়ে প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করতে শুরু করেন। ঠিকঠাক বিশ্রাম নিতে পারেন না। এর ওপর যোগ হয় পুষ্টিকর খাবারের অভাব। মধ্যপ্রাচ্যের ৫০ থেকে ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ— সব মিলিয়ে তাদের অত্যন্ত প্রতিকূল ও রূঢ় পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়। এই শ্রমিকদের বড় অংশের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ডাক্তারও দেখাতে পারেন না। ফলে হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেইন স্ট্রোকে মারা যান। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড ও বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা তো আছেই।
আগামীর সময়: প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ উদাসীন কেন?
শরিফুল হাসান: দেখুন, বাংলাদেশের নাগরিককে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন কতটুকু সম্মান করবে— তা নির্ভর করে আপনি আপনার নাগরিকদের কতটা সম্মান করেন, তার ওপর। আপনি কি আপনার নাগরিকদের বিমানবন্দরে কিংবা দূতাবাসে তাদের যথাযথ সম্মান দেন? মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বা মালয়েশিয়া যখন দেখে, বাংলাদেশের দূতাবাসের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও আমাদের শ্রমিকরা কোনো সেবা পায় না— তখন তারা আমাদের শ্রমিকদের সঙ্গে অবিচার করার সুযোগ পায়। কই, তারা তো ভারত, শ্রীলঙ্কা কিংবা ফিলিপিনের শ্রমিকদের সঙ্গে এরকম করে না। আমরা আসলে জানি না, কী করে আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষা বা মর্যাদা দিতে হবে। আমরা বরং মনে করি যে এরা টাকা পাঠানোর মেশিন; এদের বিদেশে পাঠাও, এরা দেশের রেমিট্যান্স দেবে।
আগামীর সময়: সংকটটা আসলে কোথায়? বাংলাদেশ কেন নিজের শ্রমিকদের এই ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে?
শরিফুল হাসান: সংকটটা অনেক জটিল। বহুমুখী সংকট। প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ লাখ তরুণ আমাদের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। দেশের মধ্যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারিনি আমরা। স্বাধীনতার পর বছরে ৪-৫ হাজার লোক বিদেশে যেত। এখন বছরে ১০-১২ লাখ লোক বিদেশে যায়। কারণ, এখানে সরকারের কোনো বিনিয়োগ নেই। যেহেতু দেশের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংকট, তাই তরুণরা যেকোনো মূল্যে দেশের বাইরে চলে যেতে চায়, কোনো কিছু না শিখেই। রাষ্ট্রও চায় যে আমার নাগরিক যেকোনো মূল্যে দেশের বাইরে চলে যাক, সে কাজ করুক। মাইগ্রেশন হচ্ছে ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয়। কিন্তু আমরা মাইগ্রেশনকে বাধ্যবাধকতার জায়গায় নিয়ে গেছি। দেখবেন, ঢাকা ইউনিভার্সিটি, আইবিএ থেকে পাস করা, বুয়েট থেকে পাস করে ভালো বেতনে চাকরি করা তরুণরাও চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডায়। সে ভাবছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় চলে যেতে পারলেই সফল। কারণ, সমাজ এভাবেই দেখতে অভ্যস্ত। আর যে লেখাপড়া জানে না, সে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যাওয়ার চেষ্টা করে।
আমরা যখন কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনায় বসি, অদক্ষ অভিবাসনের কারণে আমরা শুরুতেই দুর্বল প্রতিপক্ষ হয়ে পড়ি
বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর সেই দেশগুলোর মধ্যে প্রথম, যে দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি লোক লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করে। ইতালি ও গ্রিসে ইললিগ্যাল মাইগ্রেশনের দিক থেকে বাংলাদেশ ফার্স্ট। বাংলাদেশের পরে রয়েছে সুদান, আফগানিস্তানসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো। তারা যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য অভিবাসী হচ্ছে। বাংলাদেশে তো যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ নেই, তবুও কেন সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা প্রথম? এটার কারণ শুধু অর্থনৈতিক না। মানুষ আসলে দেশে নিরাপদ বোধ করছে না। আপনি যখন দেশের মধ্যে সুশাসন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না– তখনই মানুষ পালাবে।
আগামীর সময়: ইদানীং দেখা যাচ্ছে, দেশ থেকে অনেকেই রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। এ মানুষগুলো জীবনের চরম ঝুঁকি জেনেও কেন যাচ্ছে?
শরিফুল হাসান: অভিবাসন খাতে তিনটি জায়গা খুব গুরুত্বপূর্ণ— যে যাচ্ছে, যে পাঠাচ্ছে (রিক্রুটিং এজেন্সি) এবং যে নিচ্ছে (নিয়োগকর্তা)। এই তিন পক্ষেরই নিজস্ব দায়ভার রয়েছে। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, আমাদের দেশ থেকে যে যাচ্ছে, সে ভীষণ মরিয়া। কালকেই ১০ লাখ টাকা দিয়ে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য সে প্রস্তুত; কিন্তু ১০ হাজার টাকা খরচ করে বা ফ্রিতে সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে দক্ষ করা কিংবা ভাষা শেখার তাগিদ তার মধ্যে নেই।
মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট-সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, ভৈরব অঞ্চলের অভিবাসীদের মধ্যে সাগরপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার চরম প্রবণতা দেখা যায়। গত ৪-৬ বছরে শুধু লিবিয়া থেকেই ফেরত এসেছে ১৫ হাজার মানুষ, আর মধ্য ভূমধ্যসাগর হয়ে ঢুকতে গিয়ে আটক হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বাংলাদেশি। এরকম অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অ্যাসাইলামের আবেদন ৯৯% ক্ষেত্রেই রিজেক্ট হয়। তবুও তারা ঝুঁকি নিচ্ছে। ঠিক একইভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও প্রলোভনে পড়ে মানুষ ভাবছে, মাসে ২০-৩০ লাখ টাকা পাবে। কিন্তু টাকা পাওয়ার বদলে চলে যাচ্ছে জীবন।
এখানে আমাদের রাষ্ট্রের তদারকি ও সচেতনতামূলক ব্যবস্থার বড় ঘাটতি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে ঢিলেঢালা ভাব আছে। রাষ্ট্র নাগরিককে সচেতন করতে পারছে না বলেই আজ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যেমন মানুষ মরছে, তেমনি কম্বোডিয়া গিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়ছে কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতনতার যেমন অভাব আছে, আবার তার কাছে বিকল্প কিছু নেই বললেও চলে। সে জন্য জেনে-বুঝে সে আসলে পালাতে চায়, ঝুঁকিটা নেয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন জেলখানা বা ডিটেনশন সেন্টার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ ‘ডিপোর্টি’ হিসেবে দেশে ফেরে। কোথাও আমাদের নাগরিকদের মানবিক মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করতে পারছি না। মেয়েদের সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠাচ্ছি। সেখানে তারা শারীরিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। গত কয়েক বছরে ৮০০ নারীর শ্রমিকের লাশ দেশে এসেছে। একজন সৌদি নিয়োগকর্তাকেও কি শাস্তির আওতায় আনা গেছে? একজন নাগরিকের নিপীড়নও পুরো দেশের জন্য বড় সংকট। নাগরিকের অধিকার ও সুরক্ষা শুধু কাগজে-কলমে আটকে রাখলে এই অমানবিক পরিণতি ঘটতেই থাকবে।
আগামীর সময়: মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের পাশবিক নির্যাতনের প্রসঙ্গে বললেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কেন কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগে ব্যর্থ?
শরিফুল হাসান: মূল সমস্যা হলো আলোচনার টেবিলে আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতা। যখনই আমরা যখন কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনায় বসি, অদক্ষ অভিবাসনের কারণে আমরা শুরুতেই দুর্বল প্রতিপক্ষ হয়ে পড়ি। কিন্তু এটাকে তো শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। সৌদি আরব বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে আমাদের কর্মীরা কায়িক পরিশ্রম দিয়ে তাদের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখছে। এটি কোনো দয়া নয়। আমাদের শ্রম ছাড়া তাদের চলবে না— এই শক্তিটা উপলব্ধি করে শক্ত শর্ত দেওয়ার মতো কূটনৈতিক জোর আমাদের নেই।
যেহেতু দেশের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংকট, তাই তরুণরা যেকোনো মূল্যে দেশের বাইরে চলে যেতে চায়, কোনো কিছু না শিখেই। রাষ্ট্রও চায় যে আমার নাগরিক যেকোনো মূল্যে দেশের বাইরে চলে যাক, সে কাজ করুক। মাইগ্রেশন হচ্ছে ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয়। কিন্তু আমরা মাইগ্রেশনকে বাধ্যবাধকতার জায়গায় নিয়ে গেছি
নেপাল, ভারত বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো কিন্তু নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় কঠোর দরকষাকষি করে। সৌদিতে ফিলিপাইনের নারী শ্রমিকদের একাধিক নির্যাতনের ঘটনা সামনে এলে ফিলিপাইনের সংসদীয় দল সরেজমিন তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা আর ডমেস্টিক ওয়ার্কার পাঠাবে না, শুধু কেয়ারগিভার বা হাই-স্কিলড লোক পাঠাবে। তখন সৌদি আরব বাংলাদেশকে চাপ দিল— নারী শ্রমিক না দিলে পুরুষ কর্মীও নেব না। আর আমরা কেবল বাজার ধরে রাখার লোভে প্রটেকশন মেকানিজম বা সঠিক বেতন নিশ্চিত না করেই আমাদের মেয়েদের সেখানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা বাজার খোলার জন্য মেয়েদের সৌদি আরবে পাঠাতে রাজি হয়ে গেলাম। সৌদি আরবকে কি আমরা বলতে পেরেছি, ‘আমাদের এতগুলো মেয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছে, তোমরা প্রত্যেকটা ঘটনার তদন্ত করো?’ আমরা বলতে পারিনি।
আগামীর সময়: মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার একবার খোলে, আবার বন্ধ হয়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খায় কেন?
শরিফুল হাসান: দেখুন, আমাদের দেশের শ্রমিকদের কাছে মালয়েশিয়া সবসময়ই পছন্দের। আবহাওয়াও আমাদের সঙ্গে মিলে যায়। ১৯৭৮ সালে মাত্র ২৬ জন কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে সেখানে আমাদের লোক যাওয়া শুরু হয়। কিন্তু আপনি যদি গত ৪৮ বছরের ইতিহাস দেখেন, প্রতিবারই মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে, কর্মীদের নির্যাতন করা হয়েছে। কখনো ২৫ জন, কখনো ১০০ জনের সিন্ডিকেট তৈরি করে এই শোষণ চালানো হয়েছে। প্রতিবার সমস্যা হলে তারা বলে, ‘আগের নিয়মটা খারাপ ছিল, এবার আমরা নতুন ও ভালো ব্যবস্থাপনায় লোক নেব।’ কিন্তু দেখা যায়, নতুন পদ্ধতি আসার পর নিপীড়নের মাত্রা আরও বাড়ে এবং একপর্যায়ে বাজারই বন্ধ হয়ে যায়। এই কর্মী নেওয়া আর বন্ধ করার বিষয়টাকে তারা একধরনের ব্যবসায় পরিণত করেছে। মালয়েশিয়ার কিছু লোক আর আমাদের দেশের কিছু লোক মিলে একটা চক্র গড়ে তুলেছে। যেখানে সরকার নির্ধারিত ফি হয়তো ৩৭ বা ৮৪ হাজার টাকা, সেখানে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে এখানে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো— আমরা এই চক্রকে আইনের আওতায় আনতে পারিনি। মালয়েশিয়া যদি বলে ২৫ বা ৩০ জনের সিন্ডিকেটের বাইরে তারা লোক নেবে না, তবে বাংলাদেশের সোজা জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, আমরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোনো কর্মী পাঠাব না। দরকারে মালয়েশিয়ার বাজার আরও কিছুদিন বন্ধ থাকুক। কারণ, মালয়েশিয়ায় যেসব কঠিন কাজ বাংলাদেশিরা করে, সেগুলো অন্য দেশের শ্রমিকরা করবে না। তাদের আমাদের লোক তাদের লাগবেই।
আগামীর সময় : একটু আগে বলছিলেন, কয়েকটি জেলায় দালাল চক্র সক্রিয়। স্থানীয়রা সেই দালালদের চেনে, প্রশাসনও চেনে, পত্রিকায় তােদর নাম উল্লেখ করে সংবাদ ছাপা হয়। কিন্তু এই চক্রের কিছুই হয় না কেন?
শরিফুল হাসান: লিবিয়া বা নির্দিষ্ট করে বললে, ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসনের পেছনে মূলত কয়েক ধাপে বিভক্ত একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র কাজ করে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর কিংবা সিলেটের মতো আঞ্চলিক দালালদের প্রধান কাজ শুধু লোক সংগ্রহ করা। বিভিন্ন ধাপে এদের কেনাবেচা বা হস্তান্তর চলে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঝেমধ্যে স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে দেখা যায়। কিন্তু এভাবে ১০০ জন স্থানীয় দালালকে গ্রেপ্তার করলেও সংকটের সমাধান হবে না; একজনকে ধরলে আরেকজন সে জায়গায় চলে আসে। এটি আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র, যেখানে বিশাল অর্থের লেনদেন হয়। লিবিয়াতে কাউকে জিম্মি করে সেই অর্থ আদায় করা হয় বাংলাদেশে। কাজেই এ চক্র ভাঙতে হলে ঢাকা, দুবাই বা ইতালিতে বসে যারা মূল কলকাঠি নাড়ছে, সেই রাঘববোয়ালকে চিহ্নিত করতে হবে।
আগামীর সময়: আমাদের যেসব প্রবাসী শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের সুরক্ষায় আইএলওর ভূমিকা ঠিক কতটা কার্যকর?
শরিফুল হাসান: সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে আইএলও চাইলেও সরাসরি কাজ করতে পারে না। কারণ সেসব দেশে আইএলও কিংবা কোনো বেসরকারি সংস্থাকে (এনজিও) স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি বা সুযোগ দেওয়া হয় না। তবে মালয়েশিয়াসহ কিছু দেশে আইএলওর কার্যক্রম রয়েছে। সেখানে শ্রমিক নিয়োগের সিন্ডিকেট ও নানা অনিয়ম নিয়ে তারা একাধিকবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন ও অধিকারবঞ্চনা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্টেও আইএলও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। তবে মূল সত্য হলো— আইনি সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। আমি যদি আমার নাগরিকদের অধিকারের দিকে নজর না দিই, সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হই তাহলে অন্য কেউ যে তা নিশ্চিত করবে, এই আশা করাটা আসলে বোকামি।
আগামীর সময়: আপনি তো ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। নিরাপদ অভিবাসনে আপনারা কীভাবে কাজ করছেন?
শরিফুল হাসান: ব্র্যাক বিশ্বাস করে, প্রত্যেক মানুষের সম্ভাবনা আছে এবং কারোই নিপীড়নের শিকার হওয়া উচিত নয়। আমাদের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম মূলত তিনটি বিষয়ে কাজ করে— দক্ষতা ও সচেতনতা বাড়িয়ে জেনে-বুঝে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, ভূমধ্যসাগরসহ বিভিন্ন পথে মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন রোধ করা এবং বিদেশ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিঃস্ব হয়ে ফেরত আসা প্রবাসীদের বিমানবন্দর সহায়তা, কাউন্সেলিং ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন প্রদান করা।
গত আট বছরে আমরা বিমানবন্দরে প্রায় ৪০ হাজার সংকটগ্রস্ত প্রবাসী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘প্রত্যাশা’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবাসফেরতদের পুনর্বাসনে কাজ করেছি। যেমন— সম্প্রতি ১০ বছর বয়সে পাচার হওয়া এবং দুই পা হারানো এক তরুণকে দীর্ঘ ২৫ বছর পর আমরা তার কক্সবাজারের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি, যা পরিবারচ্যুত প্রবাসীদের স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ১৬৪তম ঘটনা।
আমরা এমন একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করতে চাই যেন আমাদের েদশের মানুষকে আর সাগরে ডুবে বা প্রবাসে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ দিতে না হয়।
আগামীর সময়: আপনাকে ধন্যবাদ।
শরিফুল হাসান: আপনাকেও ধন্যবাদ।







