নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে জোর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সিএমএসএমই শিল্প খাতের সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. এহতেশামুল হক খান
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্যে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কী ধরনের বিশেষ অর্থায়ন ও সহায়তা দিয়েছে?
উত্তর: ডাচ্-বাংলা ব্যাংক বিশ্বাস করে, দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি আরও বেশি উদ্যোক্তানির্ভর হবে এবং সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবেন তরুণ ও নারী উদ্যোক্তারা। আমরা মনে করি, একজন উদ্যোক্তার সফলতার জন্য শুধু অর্থায়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব। তাই অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে আমরা একটি সমন্বিত সহায়তা কাঠামো গড়ে তুলেছি।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমাদের দুটি বিশেষায়িত সিএমএসএমই ঋণপণ্য— ‘উৎসাহ’ ও ‘সফলতা’-এর মাধ্যমে বার্ষিক ৫ শতাংশ সুদে টার্ম লোন এবং ক্যাশ ক্রেডিট সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে ‘অঙ্কুর’ স্টার্টআপ ফান্ডের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট (ওভিওপি) উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পের বিকাশে অর্থায়ন এবং সহায়তা করছি। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে গ্রিন ফিন্যান্সিংয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।
প্রশ্ন: অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে। এই ব্যবধান কমাতে কী করা উচিত?
উত্তর: দেশের অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। ফলে তারা শুধু ঋণ নয়, বরং সঞ্চয়, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবার সুবিধা থেকেও বঞ্চিত থাকেন। এই ব্যবধান কমাতে হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও বিস্তৃত, সহজলভ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
সহজ হিসাব খোলা, ডিজিটাল অনবোর্ডিং, এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণ, আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেডিট মূল্যায়নের মতো উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (সিজিএস), পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং এবং স্টার্টআপ ফান্ডের মতো কর্মসূচির আরও বিস্তৃতি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করবে।
বর্তমানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ২৪৩টি শাখা, ৩৪৪টি উপশাখা, ৫ হাজার ৬৩৫টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট, ১ হাজার ৫১৬টি ফাস্ট ট্র্যাক এবং ৬ হাজার ৩২৯টি সিআরএম ও এটিএমের মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। আজ আমরা ৬ দশমিক ৫৮ কোটিরও বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছি, যার মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার। আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া নয়; বরং উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে স্থায়ীভাবে সম্পৃক্ত করা।
প্রশ্ন: এসএমই ঋণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি কোথায় দেখেন?
উত্তর: সিএমএসএমই ঋণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি উদ্যোক্তার মধ্যে নয়, বরং ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশে। মূল্যস্ফীতি, কাঁচামালের দামের ওঠানামা, বাজারের অনিশ্চয়তা, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আর্থিক তথ্যের সীমাবদ্ধতা উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
তবে বাস্তবতা হলো, সিএমএসএমই ঋণকে অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে আমরা তথ্যভিত্তিক ক্রেডিট মূল্যায়ন, সমন্বিত ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়া এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দায়িত্বশীল ঋণব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করছি। আমাদের লক্ষ্য ঝুঁকি এড়িয়ে চলা নয়; বরং দায়িত্বশীল অর্থায়নের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উদ্যোক্তা তৈরি করা।
প্রশ্ন: এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুদ সুবিধা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
উত্তর: অবশ্যই। বিশেষ করে নতুন, নারী, তরুণ ও উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক স্বল্পসুদের অর্থায়ন ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রাথমিক ব্যয় কম হলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে পারেন।
তবে শুধু সুদহার কমানোই যথেষ্ট নয়। সহজ ও দ্রুত ঋণপ্রক্রিয়া, কার্যকর ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থা, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং এবং ব্যবসায়িক পরামর্শ— সব মিলিয়ে একটি উদ্যোক্তাবান্ধব অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এরই মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ঋণ ও অগ্রিমের ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা আমাদের সিএমএসএমই কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণ করছি।
প্রশ্ন: নারী উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়?
উত্তর: দেশে নারী উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় একটি সহায়ক পরিবেশের অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই মার্কেট লিংকেজ বা বাজার সংযোগের ঘাটতি, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে সীমিত অংশগ্রহণ, আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতি এবং সামাজিক দায়িত্ব একসঙ্গে তাদের অগ্রযাত্রাকে কঠিন করে তোলে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের পাশাপাশি বাজার সংযোগ, ব্যবসায়িক পরামর্শ, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মেন্টরশিপ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এতে তারা শুধু ব্যবসা শুরুই করবেন না, বরং দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।
প্রশ্ন: এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, সহজ ও ঝামেলামুক্ত করতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক কী ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নিয়েছে?
উত্তর: বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশে সময়ই একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই প্রযুক্তির মাধ্যমে ঋণপ্রক্রিয়াকে দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করা এখন ব্যাংকিং সেবার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
আমাদের সমন্বিত ডকুমেন্টেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (ডিএমএস) মাধ্যমে ঋণ আবেদন, তথ্য যাচাই, ক্রেডিট মূল্যায়ন, অনুমোদন, বিতরণ এবং নথি সংরক্ষণের পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। এর ফলে কাগজনির্ভরতা কমেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বেড়েছে এবং ঋণ অনুমোদনের সময় উল্লেখযোগ্য হ্রাস পেয়েছে।
ডেটাভিত্তিক মূল্যায়ন, ডিজিটাল তথ্য যাচাই এবং স্বয়ংক্রিয় কর্মপ্রবাহের মাধ্যমে যোগ্য উদ্যোক্তাদের দ্রুত অর্থায়নের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি বর্তমানে প্রায় এক কোটি গ্রাহক নেক্সাসপে অ্যাপ ব্যবহার করছেন, যা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার প্রতি গ্রাহকদের আস্থার প্রতিফলন।




