খালের পুনর্জাগরণ : সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথরেখা

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে নদী ও খালের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একসময় দেশের গ্রামাঞ্চলে খাল ছিল যোগাযোগের পথ, কৃষির প্রাণশক্তি, মৎস্যসম্পদের আধার এবং প্রাকৃতিক জলনিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম।
কিন্তু গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল, দূষণ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের হাজার হাজার খাল হারিয়ে গেছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা, কৃষিতে পানির সংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খনন ও পুনঃখননের যে উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। তবে শুধু খনন করলেই হবে না; এই উদ্যোগকে একটি সমন্বিত পরিবেশ ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। কারণ খাল পুনরুদ্ধার শুধু পানি প্রবাহের বিষয় নয়, এটি জলবায়ু অভিযোজন, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। প্রতিবছর কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় খাল একটি প্রাকৃতিক অবকাঠামো হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের মাধ্যমে খাল জলাবদ্ধতা কমায়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে কৃষি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ খাল একই সঙ্গে বন্যা ও খরা উভয় ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করে।
বর্তমানে দেশের অনেক অঞ্চলে দেখা যায়, অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তা ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া। খালগুলো সচল করা গেলে জলাবদ্ধতার সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সেচের পানির প্রাপ্যতা। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে মেনে যাচ্ছে।
খাল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা সম্ভব। খালে পানি সংরক্ষণ করা গেলে সেচের জন্য কৃষকদের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে সেচ ব্যয় কমবে, কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে এবং কৃষি আরও টেকসই হবে। এ ছাড়া বোরো, আমন ও রবি ফসল উৎপাদনে খালের পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে পানির সংকট আরও বাড়তে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে খাল ও জলাশয়ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
খাল শুধু পানির পথ নয়; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। অসংখ্য দেশীয় মাছ, উভচর প্রাণী, জলজ উদ্ভিদ ও পাখির জীবনচক্র খালের সঙ্গে সম্পর্কিত। খাল ভরাট বা দূষিত হয়ে গেলে এসব প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয় এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে একসময় যে দেশীয় মাছ সহজলভ্য ছিল, তার অনেকগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়। এর পেছনে জলাশয় ও খালের সংকোচন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। খাল পুনঃখনন এবং প্রাকৃতিক সংযোগ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে সচল খাল পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখে, দূষণের মাত্রা কমায় এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ফলে খাল পুনরুদ্ধারকে পরিবেশ সংরক্ষণের একটি কার্যকর প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। খালকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা কার্যক্রম খালনির্ভর ছিল। খাল পুনরুদ্ধার হলে এসব খাত নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
বিশেষ করে মৎস্য খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব উল্লেখযোগ্য হবে। খালে মাছ চাষ ও প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বাড়বে এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে খালের পাড়ে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের বাগান গড়ে তোলা গেলে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অনেক এলাকায় ছোট নৌযান চলাচল আবার চালু করা গেলে পরিবহন ব্যয়ও কমে আসবে। ফলে খাল পুনঃখননকে শুধু পানি ব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত।
তবে বাস্তবতা হলো, খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়; এটিকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দখলদারিত্ব। দেশের বহু খাল প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে গেছে। কোথাও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও আবর্জনা ফেলে খাল ভরাট করা হয়েছে। দখলমুক্ত না করে খাল পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে পুনঃখননের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই খাল আবার পলি জমে ভরাট হয়ে যায়। এতে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও স্থায়ী সুফল পাওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক সময় প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচিকে দীর্ঘমেয়াদি সফলতায় রূপ দিতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, দেশের সব খালের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ ও মানচিত্র তৈরি করতে হবে। আধুনিক জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে খালের অবস্থান, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং দখলের চিত্র নিয়মিত হালনাগাদ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, খাল দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তৃতীয়ত, খাল পুনঃখননের সঙ্গে সঙ্গে খালের দুই তীরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে ভূমিক্ষয় কমবে, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে এবং কার্বন শোষণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। চতুর্থত, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে খাল ব্যবস্থাপনার কমিটি গঠন করতে হবে। জনগণের মালিকানা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। পঞ্চমত, খালভিত্তিক কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত, যাতে খাল পুনরুদ্ধারের অর্থনৈতিক সুফল সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে যায়।
বিশ্ব জুড়ে বর্তমানে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বাংলাদেশের খাল, নদী ও জলাভূমি পুনরুদ্ধারও তেমন একটি প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান। এটি একদিকে পরিবেশ রক্ষা করবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করবে। খাল পুনরুদ্ধারকে যদি শুধু একটি খনন প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি এটিকে জলবায়ু অভিযোজন, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সমন্বিত উন্নয়নের কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এটি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে আরও পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করতে হলে খালকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার প্রাকৃতিক রূপে। আজকের খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ আগামী দিনের নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে পারে। তাই সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, স্থানীয় সরকার, গবেষক, কৃষক এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খালকে বাঁচাতে হবে। খাল বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, কৃষি বাঁচবে, গ্রাম বাঁচবে আর তাতেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
[email protected]




