সম্পাদকীয়
পকেটে পাওয়ার হাউজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদ্যুৎ সংকটে একদিকে যখন শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করছেন, অন্যদিকে দেশের আনাচে-কানাচে অবৈধভাবে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জের ব্যবসা চলছে। বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি সংযোগ, মিটারবিহীন লাইন, আবাসিক মিটারের আড়ালে বাণিজ্যিক ব্যবহার ও মিটার টেম্পারিংয়ের মহোৎসব— সব মিলিয়ে এটি এখন শুধু বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের জন্য একটি বড় প্রশ্ন।
গতকালের আগামীর সময়ে হবিগঞ্জের বাস্তবতা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো জেলার গল্প নয়। হবিগঞ্জে অবৈধ টমটমের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছানোর পাশাপাশি এসব যান চার্জের কারণে স্থানীয় বিদ্যুৎব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার তথ্য আগেও প্রকাশিত হয়েছে।
হবিগঞ্জ জেলা সদরে তিন হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং পাঁচ হাজার ইজিবাইক চলাচল করে। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, তাদের ১৫০টি অনুমোদিত গ্যারেজে চার্জ হয় মাত্র দেড় হাজার অটোরিকশা ও ২ হাজার ৭০০ ইজিবাইক। অর্থাৎ, বাকি দেড় হাজার অটোরিকশা ও ২ হাজার ৩০০ ইজিবাইক নিয়মিত চার্জ হচ্ছে অনুমোদনহীন গ্যারেজে, চুরির বিদ্যুতে। এতে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯২২ টাকা, যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় অন্তত ১০ কোটি ৩৯ লাখ ৭ হাজার ২০০ টাকায়।
আর জাতীয় চিত্রটি আরও ভয়াবহ। সংসদে দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অনুরূপ ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৩০০টি। অবৈধভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ৪ হাজার কোটি টাকা হলো সরকারের রাজস্ব ক্ষতির আনুমানিক হিসাব; এটিকে সরাসরি ‘পিডিবির চুরি হওয়া বিদ্যুতের দাম’ বলা যায় না। প্রকৃত বিদ্যুৎ চুরির আর্থিক ক্ষতির ব্যাপ্তি যে হাজার হাজার কোটি টাকা, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
চার্জিংয়ের জন্য দেশে উৎপাদিত বা বিতরণকারী কোম্পানির বিদ্যুতের ওপর নির্ভর না করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা যেতে পারে। সরকার এরই মধ্যে ব্যাটারি সৌরবিদ্যুতে চার্জ দেওয়ার শর্ত রেখে বিধিমালা করার কথা জানিয়েছে।
‘যানবাহন বৈধ, বিদ্যুৎ সংযোগ অবৈধ’— এই দ্বৈত ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। কোনো অটোরিকশার নিবন্ধন থাকলেও তার চার্জিং যদি চোরাই পথে হয়, সেটি বৈধ হতে পারে না। একটি নিবন্ধিত যান, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি অনুমোদিত চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। কোন যান কোথায় চার্জ করেছে, কোন স্টেশন কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, কত টাকা বিল হয়েছে— এসব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এতে বিদ্যুৎ চুরি যেমন কমবে, তেমনি লাইসেন্স-রাজস্বও বাড়বে।
হবিগঞ্জে বছরে ১০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরির চিত্র একটি সতর্কবার্তা। জাতীয় পর্যায়ে যখন ক্ষতির হিসাব হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে, এটিকে আর ‘ছোটখাটো বিদ্যুৎ চুরি’ বলে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি হচ্ছে, বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে, বৈধ গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়ছেন এবং একই সঙ্গে সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত— বিদ্যুৎ চুরিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, চুরি বন্ধ, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি, গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করা। এই বিশাল ইজিবাইক ও অটোরিকশা খাতকে নিয়মের মধ্যে এনে রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করার এখনই সময়।



