কলঙ্কিত খাঁচা ও নতুন পাখি

২০০৪ সালে পথচলা শুরুর পর জঙ্গি দমনে যে বাহিনী একদা বাহবা কুড়িয়েছিল, কালক্রমে তা-ই হয়ে উঠল আমজনতার ত্রাস। গুম, ‘ক্রসফায়ার’ আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্তহীন খতিয়ান পিঠে নিয়ে অবশেষে বিলুপ্ত হতে চলেছে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। ‘আগামীর সময়’ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিতর্কিত বাহিনীকে হটিয়ে এখন ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস’ বা পিপিএফ নামের এক নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গড়ার খসড়া চূড়ান্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল সাইনবোর্ড আর উর্দি বদলে কি চরিত্রের বদল সম্ভব? নাকি এটি মানুষকে বোকা বানানোর পুরোনো রাষ্ট্রীয় কৌশল?
র্যাব ঘিরে সমালোচনার ইতিহাস দীর্ঘ এবং রক্তঝরা। অভিযোগ, সন্ত্রাস দমনের মোড়কে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন ও রাষ্ট্রীয় মদদে ক্ষমতার অপব্যবহারই হয়ে উঠেছিল এর প্রধান কাজ। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সেই নৃশংস সাত খুনের ঘটনা এ দেশের মানুষ আজও ভোলেনি। অর্থের বিনিময়ে খোদ র্যাবকর্তারা যেভাবে খুনের খেলায় মেতেছিলেন, তা আন্তর্জাতিক মহলেও নাড়া দিয়েছিল। চলতি বছরের শুরুতে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট যে ভয়াবহ তথ্য সামনে এনেছে, তা শিউরে ওঠার মতো। সেখানে দেখা গেছে, দেশের মোট গুমের ঘটনার ২৫ শতাংশের সঙ্গেই জড়িয়ে এই বাহিনীর নাম। এমনকি যে ৪০টি গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’-এর সন্ধান মিলেছে, তার ২২টিই ছিল র্যাবের দখলে। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় তিনশ ক্রসফায়ারের কালিমা লেগেছে তাদের গায়ে। ২০২১ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই পাপের বোঝা এতটাই ভারী হয়ে ওঠে যে, বাহিনীর বিলুপ্তি ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
এবার আসা যাক নতুন অবয়ব পিপিএফ-এর প্রসঙ্গে। প্রস্তাবিত আইনের খসড়া বলছে, এই বাহিনীর কাজ হবে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার এবং সন্ত্রাস দমন। অবিকল র্যাবের মতোই বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে এই দল, যার মাথায় থাকবেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু খটকাটা ঠিক এখানেই। যে আটটি কর্মপরিধির কথা বলা হয়েছে, তার কোন কাজটি নিয়মিত পুলিশ বাহিনী দিয়ে করানো সম্ভব নয়? তাছাড়া, র্যাবের সব সম্পত্তি ও দায়দেনা যদি এই নতুন বাহিনীতে বর্তায়, তবে পুরনো মানসিকতা থেকে তারা মুক্ত হবে কী করে?
ইতিহাস সাক্ষী, এ দেশে কোনো বিশেষ কারণ বা সমালোচনার মুখে বাহিনীর নাম ও পোশাক বদল নতুন কিছু নয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর রাতারাতি বিজিবি হয়েছে। পুলিশের পোশাক ও লোগো বদলেছে বহুবার। কিন্তু তাতে কি পুলিশের ঔপনিবেশিক মানসিকতা বদলেছে? সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আমজনতার ক্ষোভ তো কমেনি। শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, নামে কী বা আসে যায়। গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক, তার সুবাস একই থাকে। কিন্তু কাঁটার আঘাতও তো নাম বদলালে কমে না।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পিপিএফ যেন আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে কাজ না করে। বরিশালের লিমনের পা হারানোর বেদনা কিংবা অগণিত পরিবারের স্বজনহারা কান্না যেন এই নতুন বাহিনীকে তাড়া করে না ফেরে। পিপিএফ যেন ক্ষমতার লাঠিয়াল না হয়ে প্রকৃত অর্থেই নাগরিকের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠে। নামের চমক নয়, কাজের স্বচ্ছতাই হোক তাদের পরিচয়। না হলে, খাঁচা বদলালেও ডানা ভাঙার সেই চেনা আর্তনাদ কোনোদিন থামবে না।




