আগামীর চোখ
মবের স্পেশাল ক্লাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
বন্ধু
আশা করি স্কুলের দিনগুলোর মতো তুই এখনো বহাল তবিয়তে আছিস এবং প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও পিঠ চুলকানোর ছলে নিজের মেরুদণ্ডটা চেক করে দেখিস যে, ওটা সোজা আছে কি না। যে কারণে তোকে চিঠি লেখা— আজ সকালে খবরে দেখলাম, দুই বছর পরে স্কুলে ফিরে মবের শিকার প্রধান শিক্ষক। খবরটা পড়ার পর থেকে হাসব না কাঁদব, বুঝতে পারছি না।
অতীতে মব করে যে শিক্ষককে তারা বিদায় করেছিল, ভুল বুঝতে পেরে তাকেই আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল শিক্ষার্থীরা। ছাত্রদের এই অতি-উষ্ণ আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্যার যখন বুক ফুলিয়ে, পকেটে কলম গুঁজে স্কুলে পা রাখলেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির হলো একদল ‘সচেতন এলাকাবাসী’। আমাদের দেশের এই এক অদ্ভুত প্রজাতি রে বন্ধু! দেশের কোনো উন্নয়নমূলক কাজে এদের খুঁজে পাওয়া না গেলেও, কোথাও কোনো মারামারি বা মব তৈরি করতে হলে এরা সেকেন্ডের মধ্যে ল্যান্ডমাইনের মতো ফেটে পড়ে।
আজকাল মব জাস্টিস বা এই গণধোলাই সংস্কৃতি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে অলিম্পিকে একে নতুন ইভেন্ট হিসেবে চালু করা উচিত
প্রধান শিক্ষক হয়তো ভেবেছিলেন, দুই বছর বাইরে কেটে গেছে, শিক্ষার্থীরাও তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে, পরিস্থিতি ঠান্ডা, এখন তিনি সগৌরবে চেয়ারে বসবেন, আর ছাত্র-জনতা তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করবে, সহকর্মীরা ‘স্বাগতম’ ব্যানার টানাবে। আহা, শিক্ষকের এই সরলতা দেখে দেশের রাজনৈতিক দলের অভিজ্ঞ নেতারাও হয়তো লজ্জা পেয়েছেন! শিক্ষক মহোদয় ভুলে গিয়েছিলেন যে, আজকাল স্কুলগুলো আর শুধু শিক্ষার আলো ছড়ায় না, বরং ‘লাইভ অ্যাকশন থ্রিলার’ সিনেমার শুটিং স্পট হয়ে গেছে। শিক্ষক পা রাখতেই একদল ‘উৎসাহী জনতা’ তাকে এমন রাজকীয় সংবর্ধনা দিল যে, ভদ্রলোক নিশ্চিত ভেবেছেন, এর চেয়ে বাড়িতে বসে বেকার থাকা অনেক বেশি নিরাপদ ছিল।
আজকাল মব জাস্টিস বা এই গণধোলাই সংস্কৃতি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, অলিম্পিকে একে নতুন ইভেন্ট হিসেবে চালু করা উচিত। আর আমাদের দেশের মানুষ তো এতে নির্ঘাত সোনা জিতবে! একজন প্রধান শিক্ষককে সাইজ করতে কোনো আইন-কানুন, প্রমাণের প্রয়োজন নেই; জাস্ট একটা হুজুগ আর জনাপঞ্চাশেক উৎসাহী মানুষের চিৎকারই যথেষ্ট। শিক্ষকরা আগে আমাদের মানুষ বানাতেন আর এখনকার মব শিক্ষকদের ‘মানুষ’ থেকে সরাসরি ‘ভিকটিম’ বানিয়ে ছাড়ে।
বন্ধু, তোকে একটা ফ্রি পরামর্শ দিই। তোর ছেলে-মেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা পাইলট বানানোর স্বপ্ন দেখাস, কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ভুলেও কখনো শিক্ষক বানানোর কথা ভাবিস না। যদি কখনো দেখিস তারা শিক্ষক হতে চাইছে, তবে তাদের ধরে সোজা কোনো কুস্তির আখড়ায় ভর্তি করে দিস। কারণ, আগামী দিনে চক আর ডাস্টারের চেয়ে সেলফ ডিফেন্সের ব্ল্যাক বেল্টটা শিক্ষকতায় বেশি কাজে দেবে।
ইতি
তোর অভাজন বন্ধু



