সম্পাদকীয়
বিচার যেন বিলম্বিত না হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার সাংবিধানিক। আইনানুযায়ী কোনো কারণ ছাড়া জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। আর এ স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম ঢাল হলো ‘আগাম জামিন’। বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রেপ্তারের আগেই শর্তসাপেক্ষে আদালত যে জামিন মঞ্জুর করে থাকেন, সেটিই ‘আগাম জামিন’। হাইকোর্ট বিভাগ ও দায়রা আদালত যেকোনো ক্ষেত্রে যেকোনো ব্যক্তিকে জামিন মঞ্জুরের নির্দেশ দিতে পারেন। এ রেওয়াজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আদালত নাগরিকের ন্যায্য অধিকার সমুন্নত রাখছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এখতিয়ার থাকা সত্ত্বেও আগাম জামিনের আবেদন শুনতে অনীহা প্রকাশের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার ‘আগামীর সময়’-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ‘আগাম জামিন আবেদন শুনতে অনাগ্রহ’। এ পরিস্থিতি বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষ এবং আইনজীবীদের গভীর সংকটে ফেলছে। যা সেই বিখ্যাত আইনি প্রবাদকেই— ‘Justice delayed is justice denied’ (বিলম্বিত বিচার, বিচারহীনতার শামিল) স্মরণ করিয়ে দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের কার্যতালিকা থেকে জানা যায়, বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারিবিষয়ক মামলাগুলো শুনানির জন্য ২০টি বেঞ্চ আছে। সবারই আগাম জামিনের আবেদন নিষ্পত্তি করার এখতিয়ার রয়েছে। গত ঈদুল আজহার পর হাতেগোনা কয়েকটি হাইকোর্ট বেঞ্চ আগাম জামিন আবেদন গ্রহণ ও শুনানি করেছেন। বাকিরা ফিরিয়ে দিচ্ছেন জামিনপ্রার্থীদের। আইনজীবীরা বলেছেন, বিচারকদের মধ্যে একরকমের সেলফ সেন্সরশিপ কাজ করছে। শুধু একটা বেঞ্চ আগাম জামিনের বাতিটা কোনো রকমে জ্বালিয়ে রেখেছেন। এটা স্বাভাবিক নিয়ম নয়। অগণিত মানুষ বিচারপ্রার্থী। সেখানে একটিমাত্র বেঞ্চ থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত।
দেশের প্রেক্ষাপটে নানা কারণে অনেকে হয়রানিমূলক মামলায় পড়েন। তাকে সুরক্ষা দেবেন মূলত হাইকোর্ট ও সাংবিধানিক কোর্ট। সেখানে আগাম জামিন শুনানির সুযোগ থাকলেও তা যদি না করা হয়, তাহলে তা বিচারপ্রার্থীদের অধিকার খর্বের শামিল। বলা হয়, ‘Prevention is better than cure’ (প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম)। আগাম জামিন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যা একজন নাগরিককে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচায়। একবার কোনো নিরীহ মানুষ গ্রেপ্তার হয়ে গেলে, পরে তিনি বিচারে খালাস পেলেও তার সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক যে ক্ষতি হয়, তা কোনোকিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই আগাম জামিন শুনতে অনীহা প্রকাশ করা মানে পরোক্ষভাবে নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ বিলম্বিত বা অস্বীকার করা।
বিচার বিভাগের মূল কাজই হলো নাগরিকের অধিকারকে পাহারা দেওয়া। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আগাম জামিন আবেদন শুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগে স্থায়ী বা নির্দিষ্টসংখ্যক বেঞ্চ রাখা যেতে পারে। যাতে নিয়মিত মামলার শুনানিতে ব্যাঘাত না ঘটিয়ে জরুরি বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা যায়। কোন আবেদনগুলো রাজনৈতিক বা অসদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কোনগুলো গুরুতর অপরাধের, তা দ্রুত বাছাই করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে আদালত শুধু আইন প্রয়োগের স্থান নয়; বরং তা সাধারণ মানুষের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। উচ্চ আদালত যদি আগাম জামিনের মতো সংবেদনশীল ও জরুরি বিষয়ে তার সহজাত এখতিয়ার প্রয়োগে অনীহা দেখান, তবে তা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করবে বলে আমরা মনে করি। আর এমনটি হতে থাকলে বিচারপ্রার্থীরা যাবে কোথায়?




