সম্পাদকীয়
‘জনসম্পদ’ ‘জনবোমা’ না হোক

একদা যে ব্যবস্থাটি এ দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে এক ঈর্ষণীয় মডেল হিসেবে সমাদৃত ছিল, আজ তা-ই চরম দৈন্যের মুখোমুখি। ‘আগামীর সময়’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অভাব জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনটি দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতের এক কঙ্কালসার চেহারাকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। দুই বছর ধরে দেশের মাঠপর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর যে তীব্র হাহাকার চলছে, তা কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; বরং একটি পরিকল্পিত নীরব জনবিস্ফোরণের মহড়া। ‘ডিজিটাল’ ও ‘স্মার্ট’ হওয়ার ঢক্কানিনাদের আড়ালে দেশের সাধারণ গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীরা আজ জন্মনিরোধক বড়ি, কনডম বা ইনজেকশনের মতো ন্যূনতম সরকারি পরিষেবা থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্র যখন মেগা প্রজেক্টের উৎসবে মত্ত, তখন গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আলমারিগুলো শূন্য।
সরকারি পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, এ সংকটের গভীরতা কতটা ভয়াবহ এবং উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, বিবাহিত নারীদের জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালের ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে এসে ঠেকেছে। দীর্ঘদিন কমার পর মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৪-এ। আধুনিক পদ্ধতির চাহিদাও হু হু করে কমছে। যে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষগুলো পুরোপুরি সরকারি বিনামূল্যের সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল, বাজার থেকে চড়া দামে ওষুধ বা কনডম কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। ফলে তারা বাধ্য হয়েই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার বন্ধ করে দিচ্ছেন। যার অবধারিত এবং নির্মম পরিণতি— কিশোরী মাতৃত্বের হার বৃদ্ধি এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে অনিরাপদ গর্ভপাত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আজ দরিদ্র নারীদের জরায়ুকে এক অনিরাপদ গিনিপিগে পরিণত করেছে।
প্রতিবেদনটি স্পষ্ট দেখিয়েছে, রাজবাড়ী কিংবা টাঙ্গাইলের মতো জেলাগুলোতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝোলা আজ শূন্য। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা এখন সামগ্রী বিতরণের বদলে কেবল ‘ফাঁকা পরামর্শ’ দিয়ে ফিরছেন। ওষুধ নেই, ইনজেকশন নেই, এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় আয়রন ট্যাবলেটটুকুও মিলছে না সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। মানুষ বাধ্য হয়ে জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে ভিড় করছে, ফলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ দেশের কোটি কোটি সক্ষম দম্পতির ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে এ ব্যবস্থার সঙ্গে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে হয়তো কিছু সামগ্রী মিলবে, কিন্তু গত দুই বছরের যে দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, তার দায় কে নেবে? এই দীর্ঘ সময়ে কত হাজার নারী অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বের নরকযন্ত্রণার শিকার হলেন, তার হিসাব কি আছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের নথিপত্রে?
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক খেলা নয়; এটি মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একটি দেশের নীতিনির্ধারকেরা যখন এ মৌলিক জোগানটুকু সচল রাখতে বছরের পর বছর ব্যর্থ হন, তখন বুঝতে হবে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় গলদ রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনার মতো অতি সংবেদনশীল একটি খাতে এমন দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ সংকট ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। অন্যদিকে, সামাজিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুসংস্কার এবং গোড়ামি প্রসূত কিছু প্রচারও জন্মনিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহী করে তুলতে ভূমিকা রাখছে। এসব প্রচার নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। অনাগত অন্ধকার ঠেকাতে এবং মাতৃমৃত্যুর হার রুখতে অবিলম্বে এ সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট দূর করতে হবে। অন্যথায়, যে জনসংখ্যাকে আমরা ‘জনসম্পদ’ বানানোর চটকদার স্বপ্ন দেখছি, তা অচিরেই এক অনিয়ন্ত্রিত ও বিধ্বংসী ‘জনবোমায়’ পরিণত হবে— যা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের ভঙ্গুর ব্যবস্থায় থাকবে না।




