একটি সিদ্ধান্ত, একটি সুযোগ: পুলিশকে জনবান্ধব করার প্রশ্ন

আগামীর সময় গ্রাফিক্স
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মো. কোহিনূর মিয়াকে চাকরিতে পুনর্বহালের সিদ্ধান্তটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০১১ সালে বরখাস্ত হওয়ার প্রায় দেড় দশক পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার বরখাস্তের আদেশ বাতিল করা হয়েছে। ফৌজদারি মামলাগুলোতে আদালতের খালাস এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক ফলাফল বলে মনে হতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং জনমনে যে প্রতিক্রিয়া উঠেছে, তা শুধু এই একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
কোহিনুর মিয়ার ক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল— ধানমন্ডিতে এক নারীকে নির্যাতনের এবং ময়মনসিংহের নান্দাইলে নির্বাচনকালীন সংঘর্ষের ঘটনা। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দিয়েছেন। আইনের চোখে এটি নির্দোষতার প্রমাণ। কিন্তু জনগণের মনে প্রশ্ন উঠেছে: এ ধরনের পুনর্বহাল কি শুধু আইনি প্রক্রিয়ার ফল, নাকি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন? সোস্যাল মিডিয়াতে সাম্প্রতিক কমেন্টে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হারুন, বিপ্লব, বনজ, মনিরুলদের মতো পুলিশ অফিসারদেরও সুযোগ থাকছে আগামীতে’— এটি স্পষ্ট করে দেয় যে জনগণ পুলিশের অনেক কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক টুল হিসেবে দেখে। এই পারসেপশন দূর করা এখন জরুরি।
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রভাবের ছাপ অনেক পুরনো। বিভিন্ন সরকারের আমলে পুলিশকে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে জনগণের সেবকের পরিবর্তে পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে ভয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগে আলোচিত কর্মকর্তাদের নাম যখন জনমুখে ফেরে, তখন একটি পুনর্বহালের খবর জনমনে নেতিবাচক ভাবনার উদ্রেক করে। এই ধারণা আস্থার সংকটকেও কিছুটা বাড়িয়ে দেয়।
পুলিশকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রথমত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ব্যবস্থা। পুলিশ কমিশন বা স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এসব নিশ্চিত করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের বিরুদ্ধে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত হওয়া উচিত। তৃতীয়ত, পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণে জনসেবা, মানবাধিকার ও নৈতিকতার ওপর জোর দেওয়া।
চতুর্থত, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় না দেওয়া। একই সঙ্গে নির্দোষ প্রমাণিত হলে পুনর্বহালের পথ খোলা রাখা— কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়। জনগণকে বিশ্বাস করাতে হবে যে সিদ্ধান্ত আইনের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।
কোহিনূর মিয়ার পুনর্বহাল একটি ব্যক্তিগত আইনি জয়। কিন্তু এটি পুলিশ বাহিনীর সামগ্রিক সংস্কারের সুযোগও তৈরি করেছে। যদি সরকার এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে পুলিশকে রাজনীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলে, তাহলে জনমনে জমা হওয়া ভয় ও অবিশ্বাস কমতে পারে। অন্যথায়, এ ধরনের খবর শুধু সন্দেহের জন্ম দেবে, আস্থা ফিরিয়ে আনবে না।
পুলিশ জনগণের সেবক হিসেবে দাঁড়াতে পারলে সমাজ নিরাপদ হবে। সেই লক্ষ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। জনগণের ভয় দূর করতে হলে পুলিশকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ‘সুরক্ষক’ হিসেবে।

