নতুন জোটের স্বপ্নে বিভোর নেতানিয়াহু, এটি কাজ করবে?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
গাজায় গণহত্যা অব্যাহত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যখন তখন হামলা চালানোর ফলে ইসরায়েল বিশ্বব্যাপী সমালোচনার শিকার হচ্ছে। ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক পরিসরে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। এ অবস্থায় দেশের ভেতরেও চাপে রয়েছেন এসব কর্মকাণ্ডের মূলে থাকা ব্যক্তি বেনয়ামিন নেতানিয়াহু।
চারিদিকে যখন দুঃসংবাদের ছড়াছড়ি তখন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিলেন ‘হেক্সাগন’ নামে নতুন আঞ্চলিক জোটের, যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখানো যে, ইসরায়েল এখনো বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। গাজায় নারকীয় গণহত্যা চালানো দেশের নেতৃত্বে থাকা ইসরায়েলি এই নেতা যদিও বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে উগ্র শিয়া ও সুন্নীদের বিরুদ্ধে লড়বে এই ব্লক।
গত রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান। ইসরায়েল ছাড়া জোটে থাকছে ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস এবং আরব, আফ্রিকা ও এশিয়ার আরও কিছু দেশ যাদের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। জোটের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে নেতানিয়াহু বলেছেন, আমরা মধ্যপ্রাচ্যের আশেপাশে বা অভ্যন্তরে একটি সম্পূর্ণ জোটব্যবস্থা তৈরি করব।
এই জোটের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে গাজায় নির্মম গণহত্যা চালানো দেশ ইসরায়েলের এই নেতা বলেছেন, এখানে উদ্দেশ্য হলো এমন কিছু দেশের একটি জোট গড়ে তোলা, যারা বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং লক্ষ্য সম্পর্কে একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। যেন তারা উগ্রপন্থি অক্ষগুলোর বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উগ্র শিয়া অক্ষ, যাদের ওপর আমরা কঠোর আঘাত হেনেছি, এবং উদীয়মান উগ্র সুন্নি অক্ষ।
এখন পর্যন্ত কোনো দেশ এই পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ার কথা জানায়নি। এরমধ্যে গ্রিস ও সাইপ্রাস আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) সদস্য। গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যে গ্রেপ্তারি পরোয়ান রয়েছে তা বাস্তবায়নে বাধ্য দেশ দুটি।
লন্ডনের কিংস কলেজের সিকিউরিটি স্টাডিস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হয়তো তার ধারণাকে অতিরঞ্জিত করছেন। আমি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনাকে কার্যকর কোনো জোট মনে করি না। এটি মূলত, বিদ্যমান সম্পর্কের জোড়াতালি দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।
উগ্রপন্থিদের জোট বলতে কী বুঝিয়েছেন নেতানিয়াহু
নেতানিয়াহু শিয়া অক্ষের বিরুদ্ধে নিজের বিজয় দাবি করে আসছেন বহুদিন ধরে। আবার একই কাজের পুনরাবৃত্তি করতে চাইছেন তিনি।
শিয়া অক্ষ ‘প্রতিরোধ জোট বা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ হিসেবে পরিচিত, যার কেন্দ্রে রয়েছে ইরান।
ইরান লেবাননে হিজবুল্লাহকে সমর্থন দেয়। এই গোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ২০২৪ সালে ইসরায়েল গোষ্ঠীটির নেতৃত্বের বড় অংশকে হত্যা করেছে।
ইরাকে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস এবং কাতায়েবে হিজবুল্লাহকে সমর্থন দেয় ইরান। আর তেহরানের সামরিক সহায়তা পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে ইয়েমেনের হুথিরা।
সুন্নি অক্ষ নিয়ে নেতানিয়াহু কতটা সঠিক?
বিষয়টি মোটেও তা নয়, যা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ব্যাখ্যা করছেন। ২০২৫ সালে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ছয়টি দেশে হামলা চালিয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিন, কাতার, ইরান, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেন। এছাড়া গাজা-সংশ্লিষ্ট অভিযানের সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় তিউনিসিয়া ও গ্রিসেও হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইসরায়েল মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরাক ও জর্ডানকেও হুমকি দিয়েছে।
নেতানিয়াহুর ভাষায় যেভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ সুন্নি অক্ষর কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তেমন কোনো মতাদর্শভিত্তিক সুন্নি জোট গড়ে ওঠেনি। বরং অঞ্চলের কয়েকটি সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলের আঞ্চলিক নীতির প্রতিবাদ করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ইসরায়েলি প্রচেষ্টার নিন্দা, সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলার নিন্দা এবং গাজায় চলমান গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান যখন সৌদি আরব ও মিসর সফর করেন তখন ইসরায়েল-সম্পর্কিত উদ্বেগ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল। যদিও দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক ওমের ওজকিজিলচিকের মতে, এটি কোনো মতাদর্শভিত্তিক জোট নয় বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ফল।
ভারত এই জোটে যোগ দেবে?
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তার জোটে ভারতও থাকবে। এমনসময় তিনি এ মন্তব্য করলেন যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েলে সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত কয়েক বছরে দুই নেতার মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তবে ভারতকে একটি অত্যন্ত বাস্তববাদী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়। দেশটি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ঐতিহাসিকভাবে নয়াদিল্লি জোটরাজনীতি এড়িয়ে চলেছে। একই সঙ্গে তারা চীন, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। ভারত ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গেও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, নেতানিয়াহুর বক্তব্য ভারতকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় রাজনীতিতে আরও গভীরভাবে টেনে নিতে পারে। অথচ এই পরিস্থিতি ভারত সাধারণত আদর্শগত অবস্থান থেকে বিবেচনা না করে বাস্তবভাবে সামাল দিতে পছন্দ করে। কারণ ভারতের প্রধান স্বার্থ প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে নিহিত। ইসরায়েলের আঞ্চলিক রাজনৈতিক লক্ষ্য বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হওয়া দিল্লির লক্ষ্য নয়।
গ্রিস ও সাইপ্রাস কী করবে
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর অধীনে ইসরায়েল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গ্রিস ও সাইপ্রাসকে আতিথ্য দেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোট জ্বালানি ও সংযোগ বিষয়কে কেন্দ্র করে হলেও, ধীরে ধীরে এটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বিস্তৃত হয়েছে।
গ্রিস ২০২৫ সালে ইসরায়েলের কাছ থেকে ৩৬টি পালস রকেট আর্টিলারি সিস্টেম কেনার অনুমোদন দেয়, যার মূল্য প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন ডলার। দুই পক্ষ প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা করছে, যার মধ্যে ইসরায়েল-নির্মিত বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সাইপ্রাসও ইসরায়েল-নির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেয়েছে। ভবিষ্যতে আরও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাবে।
তবে এখানেও পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। তুরস্ক ও গ্রিস সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের দিকে এগিয়েছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোটাকিস চলতি মাসের শুরুতে আঙ্কারা সফর করেছেন। সম্পর্ক স্থিতিশীল করা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো দেশ দুটির লক্ষ্য।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে যদিও বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বা প্রযুক্তিগত জোট থাকতে পারে, তবুও কেউ ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি খুব ঘনিষ্ঠ হতে চায় না। কেননা ইসরায়েল নিজেই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলের সুনাম এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে এটি এখন শুধু সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিতিশীলতাই নিয়ে আসে।
এখন কেন?
এই উদ্যোগটি এমন এক রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে এসেছে, যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ঘরে ও বাইরে প্রবল চাপে পড়েছেন।
বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, এ বছরের শেষ দিকে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকায় নেতানিয়াহুর সামনে নিজেকে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরার স্পষ্ট চেষ্টা রয়েছে। তিনি দেখাতে চান যে ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে একঘরে নয় এবং এখনও আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক-বহির্ভূত অর্থবহ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম।
দেশের ভেতরে নেতানিয়াহু বিচার বিভাগীয় সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে চাপের মুখে আছেন। পাশাপাশি, কট্টরপন্থি ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদও চলছে।
এছাড়া, তিনি ২০১৬ সাল থেকে চলা তিনটি দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি—যার মধ্যে ঘুষ, জালিয়াতি ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলায় তাকে কারাগারেও যেতে হতে পারে।
ক্রিগের মতে, ইসরায়েলের তথাকথিত ‘হেক্সাগন’ বা ছয়-পাক্ষিক উদ্যোগটিকে এক ধরনের নিরাপত্তামূলক কৌশল হিসেবে দেখা যায়।
বিশ্লেষক গোল্ডবার্গের ভাষায়, ইসরায়েলি অর্থনীতি ভালো করছে না। চাকরি হারাচ্ছেন মানুষ। বিনিয়োগ আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল যা-ই করছে, যেন কিছুই কাজ করছে না। তাহলে এমন এক কল্পনার জগতে পুরোপুরি আশ্রয় নেওয়ার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে, যেখানে আপনি মনে করছেন যে, আপনার একটি ছয়-পাক্ষিক (হেক্সাগন) জোট রয়েছে?
সূত্র: আলজাজিরা

