আগামীর সময়

এপস্টিন ফাইলস: সত্য চাপা দিচ্ছেন অভিজাত অপরাধীরা

এপস্টিন ফাইলস: সত্য চাপা দিচ্ছেন অভিজাত অপরাধীরা

সংগৃহীত ছবি


ক্রমেই আরও বেশি সংযুক্ত হয়ে ওঠা এই পৃথিবীতে অবিরাম যোগাযোগের চাপ সামলাতে যদি আপনার কষ্ট হয়, তবে প্রয়াত ধারাবাহিক শিশু যৌন নিপীড়ক জেফ্রি এপস্টিনের কথা একবার ভাবুন।


গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যে ৩০ লাখ নথি প্রকাশ করেছে, তা নিশ্চিত করে যে এপস্টিন তার গড়ে তোলা শক্তিশালী পরিচিতদের বিশাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে অস্বাভাবিক পরিমাণ সময় ব্যয় করতেন।


শুধু ইমেইল করাই যেন তার জন্য প্রায় পূর্ণকালীন একটি চাকরিতে পরিণত হয়েছিল এবং বাস্তব অর্থেই সেটাই ছিল।


বিলিয়নিয়ার, রাজপরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রনায়ক, সেলিব্রিটি, শিক্ষাবিদ ও মিডিয়া অভিজাতদের প্রতি তিনি যে ব্যক্তিগত মনোযোগ দিতেন, সেটাই তাকে এই বিশাল ক্ষমতার নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে ধরে রেখেছিল।

তার ঠিকানায় ছিল এমন সব মানুষের তালিকা, যারা পৃথিবী কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত সে ধারণা গড়ে তোলে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিই ছিল সেই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যার সাহায্যে তিনি এই শক্তিশালী ব্যক্তিদের নিজের বলয়ের আরও গভীরে টেনে আনতেন—নিউইয়র্কে এবং তার ক্যারিবীয় দ্বীপে আয়োজিত বিকৃত ও শোষণমূলক ব্যক্তিগত পার্টির জগতে।


শোনা যাচ্ছে, আরও ৩০ লাখ নথি এখনো গোপন রাখা হয়েছে। ধরে নিতে হয়, সেগুলোর বিষয়বস্তু এপস্টিনের লালিত বৈশ্বিক অভিজাতদের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর।


যত বেশি নথি প্রকাশ পাচ্ছে, ততই একটি চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে—কীভাবে এই মিত্রদের নেটওয়ার্ক এপস্টিনকে তার নিজের বিকৃত আচরণের পরিণতি থেকে রক্ষা করেছিল; তারা কেউ তার অপরাধে প্রশ্রয় দিয়েছে, কেউ সক্রিয়ভাবে তাতে অংশ নিয়েছে।


এপস্টিনের কার্যপদ্ধতি সন্দেহজনকভাবে একজন গ্যাংস্টার প্রধানের মতোই ছিল—যে নতুন সদস্যদের পূর্ণ সদস্য হওয়ার আগে একটি খুনে অংশ নিতে বাধ্য করে। পারস্পরিক অপরাধে জড়িয়ে পড়াই নীরবতার ষড়যন্ত্র নিশ্চিত করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

 

ক্ষমতার নেটওয়ার্ক

বিষয়টি শুধু এটুকু নয় যে এই প্রয়াত শিশু যৌন নিপীড়ক অর্থলগ্নিকারী কয়েক দশক ধরে প্রকাশ্যেই লুকিয়ে ছিল। তার বন্ধু ও পরিচিতদের নেটওয়ার্কও তার সঙ্গে লুকিয়ে ছিল—সবাই ধরে নিয়েছিল তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।


অল্পবয়সী নারী ও কিশোরীদের ওপর তার নির্যাতন কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ ছিল না। আসলে, তিনি ও তার প্রধান দালাল ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এই পুরো যৌন পাচারের কাজটা কার জন্য করছিলেন?


এ কারণেই প্রকাশিত লাখ লাখ নথির এত বড় অংশ সতর্কতার সঙ্গে কালো করে দেওয়া হয়েছে—মূলত ভুক্তভোগীদের রক্ষার জন্য নয় (কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পরিচয় স্পষ্ট), বরং সেই শিকারি চক্রগুলোকে রক্ষা করার জন্য, যাদের তিনি সেবা দিতেন।


এপস্টিন ফাইলের সর্বশেষ ধাপটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কারণ এটি তথাকথিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদীদের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়।


এপস্টিন ছিলেন একটি বৈশ্বিক শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে—যেখানে তথাকথিত বাম ও ডান রাজনৈতিক বিভাজনের উভয় পাশের ব্যক্তিরাই ছিল, যা বাস্তবে অনেকটাই অভিনয়মূলক।


এই ব্যক্তিদের অনেককে একসূত্রে বেঁধে রেখেছিল দুর্বল তরুণী ও কিশোরীদের প্রতি তাদের নির্যাতনমূলক আচরণ।

একইভাবে, তরুণীদের সঙ্গে ধনী পুরুষদের ছবিগুলো ইঙ্গিত দেয় যে এপস্টিন আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে আপত্তিকর প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন, যা তাদের ওপর সম্ভাব্য চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত।

একেবারে মেসোনিক ঢঙে, তার সহচরদের এই চক্র একে অপরকে রক্ষা করেছে বলে মনে হয়। এপস্টিন নিজে নিশ্চিতভাবেই ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় একটি ‘সুইটহার্ট ডিল’ থেকে সুবিধা পেয়েছিলেন।


যৌন পাচারের অসংখ্য গুরুতর অভিযোগের মধ্যে তাকে শেষ পর্যন্ত কেবল পতিতাবৃত্তির দুটি অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যা ছিল সবচেয়ে কম গুরুতর অভিযোগ। তিনি অল্প সময় সাজা ভোগ করেন।


আর কীভাবে একজন সামান্য হিসাবরক্ষক এত অবিশ্বাস্যভাবে বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেন এই রহস্য প্রতিটি নতুন তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা করে কম রহস্যময় হয়ে উঠছে। তার সময়সূচি দেখে মনে হয়, তিনি মূলত ইমেইল পাঠানো আর যৌন পার্টি আয়োজনেই ব্যস্ত ছিলেন।


শীর্ষ ধনীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়া, তাদের অনুসারীদের লালন করা, এবং তরুণীদের সঙ্গে সময় কাটাতে দ্বীপে আমন্ত্রণ—সবকিছুই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যবহৃত চিরাচরিত ‘হানিট্র্যাপ’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। সম্ভবত এপস্টিন নিজে এসবের অর্থায়ন করছিলেন না।

 
ইসরায়েলের প্রভাব

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আবারও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর—বিশেষ করে ইসরায়েলের—সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে এই সর্বশেষ নথি প্রকাশে। তবে এর ইঙ্গিত বহু আগেই ছিল।


তার ঘনিষ্ঠ এবং অস্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে, যার মিডিয়া টাইকুন বাবার মৃত্যুর পর তিনি যে ইসরায়েলের এজেন্ট ছিলেন তা প্রকাশ হয়ে যায়। এপস্টিইনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এহুদ বারাক, যিনি সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেটিও একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত ছিল।


এই অংশীদারিত্ব গত শরতে ড্রপ সাইট নিউজে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে আসে, যা এপস্টিন ফাইলের আগের একটি প্রকাশনা থেকে নেওয়া। সেসব প্রতিবেদনে দেখা যায়, এপস্টিন মঙ্গোলিয়া, কোট দিভোয়ার ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা চুক্তি করতে সহায়তা করেছিলেন।


২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সক্রিয় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইয়োনি কোরেন বারবার এপস্টিনের ম্যানহাটনের অ্যাপার্টমেন্টে অতিথি ছিলেন। একটি ইমেইলে দেখা যায়, বারাক এপস্টিনকে কোরেনের অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠাতে অনুরোধ করছেন।


কিন্তু সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রকাশ হওয়া একটি এফবিআই নথিতে এক গোপন সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এপস্টিন বারাকের ‘ঘনিষ্ঠ’ছিলেন এবং ‘তার অধীনে গুপ্তচর হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।’


২০১৮ সালে কাতারের একটি বিনিয়োগ তহবিলের সঙ্গে বৈঠকের আগে দুজনের মধ্যে হওয়া এক ইমেইল কথোপকথনে এপস্টিন বারাককে তাদের সম্পর্ক নিয়ে সম্ভাব্য উদ্বেগ দূর করতে বলেন,‘তুমি পরিষ্কার করে বলবে যে আমি মোসাদের জন্য কাজ করি না।’


এছাড়া সদ্য প্রকাশিত, তারিখবিহীন একটি অডিওতে এপস্টিন বারাককে যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির সম্পর্কে আরও জানার এবং এর প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েলের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দেন।


২০২৪ সালে ইসরায়েল গাজায় লক্ষ্যবস্তু বাছাইয়ে সহায়তার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেবা দিতে প্যালান্টিরের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।


প্রত্যাশিতভাবেই, এসব তথ্য মূলধারার গণমাধ্যমে প্রায় কোনো গুরুত্ব পাচ্ছে না—যে গণমাধ্যমের বিলিয়নিয়ার মালিক ও ক্যারিয়ারসচেতন সম্পাদকরা একসময় এপস্টিনের সান্নিধ্য কামনা করতেন।


তার বদলে, মিডিয়া অনেক বেশি মনোযোগ দিচ্ছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইঙ্গিতগুলোর দিকে, যা বলে যে এপস্টিনের রুশ নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গেও নাকি যোগাযোগ থাকতে পারে।


ফাউস্টিয় চুক্তি

এপস্টিন ফাইল প্রকাশের দাবি এতটাই উচ্চকণ্ঠ ছিল যে, এতে নিজের জন্যও বিব্রতকর তথ্য থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছে—এর একটি কারণ অবশ্যই আছে।


আমাদের ক্রমেই আরও অবক্ষয়গ্রস্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিতে যা কিছু ঘটছে, তার অনেকটাই যুক্তিসঙ্গত তো নয়ই, নৈতিক ব্যাখ্যাকেও যেন অস্বীকার করে।


পশ্চিমা অভিজাতরা গত দুই বছর ধরে গাজায় সংঘটিত গণহত্যায় সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছে, এবং তারপর এর যেকোনো বিরোধিতাকে ইহুদিবিদ্বেষ বা সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যা দিয়েছে।


এই একই অভিজাতরা গ্রহটি পুড়তে থাকলেও নির্বিকার বসে আছে; জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি তাদের লাভজনক আসক্তি ত্যাগ করতে তারা অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, এমনকি একের পর এক জরিপ দেখাচ্ছে যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিরলসভাবে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে জলবায়ু বিপর্যয় অনিবার্য।


মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক বেপরোয়া ও অবৈধ পশ্চিমা আগ্রাসী যুদ্ধ, এবং ন্যাটোর দীর্ঘদিনের উসকানি যা রাশিয়াকে ইউক্রেনে আগ্রাসনে ঠেলে দিয়েছে—এসব কেবল বিশ্বকে অস্থিতিশীলই করেনি, বরং পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।


বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা সত্ত্বেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন তাড়াহুড়ো করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেন এর অনিশ্চিত এবং সম্ভাব্যভাবে বিপুল সামাজিক মূল্য নিয়ে খুব কমই চিন্তা করা হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে চাকরির বাজারের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সত্য যাচাই করার আমাদের সক্ষমতার বিপর্যয়।


এপস্টিন ফাইল একটি উত্তর হাজির করে। যা দেখতে ষড়যন্ত্রের মতো মনে হয়, তারা ইঙ্গিত দেয়, সেটি আসলেই একটি ষড়যন্ত্র—লোভ দ্বারা চালিত।


যা সবসময় আমাদের চোখের সামনেই ছিল, সেটিই হয়তো সত্য— পশ্চিমের ক্ষুদ্র ক্ষমতাধর অভিজাত শ্রেণিতে প্রবেশের মূল্য অত্যন্ত চড়া, এবং তার জন্য যেকোনো নৈতিক বোধকে এক পাশে সরিয়ে রাখতে হয়। এর জন্য গোষ্ঠীর বাইরের যেকোনো মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ত্যাগ করাও প্রয়োজন।


চারশোরও বেশি বছর আগে, ইংরেজ লেখক ক্রিস্টোফার মার্লো— যিনি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সমসাময়িক—জার্মান লোককাহিনি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তার নাটক ডক্টর ফাউস্টাস লেখেন, যেখানে এক পণ্ডিত

মেফিস্টোফিলিসের মধ্যস্থতায় জাদুকরী শক্তির বিনিময়ে শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করতে সম্মত হয়।


এভাবেই জন্ম নিল ফাউস্টিয়ান চুক্তি, যা এপস্টিইনের মতো চরিত্র মেফিস্টোফিলেসের মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হয়। প্রখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক জোহান ভলফগ্যাং ভন গোথে ২০০ বছর পর এই গল্পটি আবার দুই পর্বের মহাকাব্য ‘ফাউস্ট’-এ উপস্থাপন করেন।


বিকৃত যুক্তি

সম্ভবত আশ্চর্যের কিছু নেই যে, এপস্টিন ফাইল নিয়ে গণমাধ্যমের শোরগোল মূলত একটি আরও সত্য গল্পকে চাপা দেওয়ার কাজই করছে—যে গল্পটি উঠে আসার জন্য সংগ্রাম করছে।


যে অভিজাত শ্রেণি একসময় এপস্টিনকে নিজেদের সার্কাসের রিংমাস্টার হিসেবে মূল্য দিত, তারাই এখন তার অপরাধে নিজেদের জড়িত থাকার দিক থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে কয়েকজন নির্বাচিত ব্যক্তির দিকে মনোযোগ ফেরাতে চাইছে—বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর ও পিটার ম্যান্ডেলসনের দিকে।


পিটার ম্যান্ডেলসন। ছবি: সংগৃহীত


এই দু’জন মোটেও প্রকৃত অর্থে বলির পাঁঠা নন। তবুও তারা একই উদ্দেশ্য সাধন করে: প্রতিশোধের জন্য ক্রমবর্ধমান জনআকাঙ্ক্ষা কিছুটা প্রশমিত করা।


এদিকে, তার বাকি চক্রের সদস্যরা হয় এপস্টিনের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বের সুপ্রতিষ্ঠিত প্রমাণ অস্বীকার করছে, নয়তো কোণঠাসা হলে সাময়িক বিচারবোধহীনতার জন্য তড়িঘড়ি ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে।


এটি একটি ভুয়া হিসাবনিকাশ। এপস্টিন ফাইল শুধু কয়েকজন ক্ষমতাবান ব্যক্তির অন্ধকার জগতই আমাদের দেখায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি সেই ক্ষমতাকাঠামোর বিকৃত যুক্তিকে উন্মোচিত করে, যা এই ব্যক্তিদের পেছনে কাজ করে।


যেসব ক্ষমতাধর ব্যক্তি এপস্টিনের ‘ললিতা এক্সপ্রেস’বিমানে করে তার দ্বীপে গিয়েছিলেন; যারা পাচার হওয়া অল্পবয়সী নারী ও কিশোরীদের কাছ থেকে ‘ম্যাসাজ’নিয়েছিলেন; এবং যারা এই শিশুদের ওপর চালানো নির্যাতন নিয়ে নির্বিকারভাবে রসিকতা করেছিলেন—তারাই নীরবে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় সহায়তা করেছেন, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চস্বরে তা করার অধিকারও সমর্থন করেছেন।


আমরা কি অবাক হই যে যারা হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশুর হত্যা ও পঙ্গুত্বের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি, এবং আরও লক্ষাধিক শিশুকে অনাহারে ঠেলে দেওয়ার বিরোধিতা করেনি—তারাই আবার ঘরের কাছেই শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের আচার-অনুষ্ঠানে জড়িত ছিল, অথবা সেগুলোকে সমর্থন করেছিল? এরাই সেই মানুষ, যারা গাজার শিশুদের পক্ষে কথা বলতে চাওয়া যে কাউকে আগে হামাসের নিন্দা করতেই বাধ্য করেছে। এরাই সেই মানুষ, যারা প্রতিটি সুযোগে শিশু মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা খাটো করার চেষ্টা করেছে, একে গাজার ‘হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের’ ঘাড়ে চাপিয়ে।


এরাই সেই মানুষ, যারা আহত ও অসুস্থ গাজার শিশুদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় হাসপাতালগুলোতে ইসরায়েলের হামলা অস্বীকার করেছে—এবং পুরো জনগোষ্ঠীকে অনাহারে রাখার বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। এরাই সেই মানুষ, যারা এখন ভান করছে যে গাজার শিশুদের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত হত্যা ও নির্যাতন নাকি একটি শান্তি পরিকল্পনা।


নব্যউদারবাদ ও জায়নবাদ

এক মুহূর্তের জন্য তার পেডোফিলিয়াকে পাশে রাখি। এপস্টিন ছিলেন পশ্চিমা সমাজে আধিপত্য বিস্তারকারী দুইটি দুর্নীতিগ্রস্ত মতাদর্শ—নব্যউদারবাদ ও জায়নবাদ এর চূড়ান্ত প্রতীকী রূপ। এ কারণেই তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে এসব ব্যবস্থার শীর্ষ স্তরে সাফল্যের সঙ্গে টিকে থাকতে পেরেছিলেন।


এই মতাদর্শগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি যে শেষ পর্যন্ত গাজায় একটি গণহত্যায় গিয়ে পৌঁছাবে, এবং আগামী বছর বা দশকগুলোতে—যদি এগুলোকে থামানো না যায়—গ্রহব্যাপী পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ বা জলবায়ু বিপর্যয়ে রূপ নেবে, তা বরাবরই অনিবার্য ছিল।


এপস্টিন পশ্চিমের রাজনৈতিক ও আর্থিক সংস্কৃতিতে কী ভীষণভাবে ভুল আছে, তার একটি সতর্ক সংকেত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি যে সতর্কবার্তা প্রতিনিধিত্ব করেন, তা আজ তার অনুপস্থিতিতেও ঠিক ততটাই চাপা দেওয়া হচ্ছে, যতটা তার জীবদ্দশায় করা হয়েছিল।


নব্যউদারবাদ হলো কোনো উচ্চতর উদ্দেশ্য বা সামাজিক কল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে, শুধুই অর্থ ও ক্ষমতার অনুসরণ। গত অর্ধশতাব্দী ধরে পশ্চিমা সমাজগুলোকে উৎসাহিত করা হয়েছে বিলিয়নিয়ার—শিগগিরই ট্রিলিয়নিয়ার—শ্রেণিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতির চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে পূজা করতে, বরং এমন একটি ব্যবস্থার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নয়, যা ভেতর থেকে পচে গেছে।


প্রত্যাশিতভাবেই, অতি-ধনী শ্রেণি ও তাদের অনুচররা আকৃষ্ট হয়েছে ‘লংটার্মিজম’নামের মতাদর্শের সমর্থকদের প্রতি—একটি আন্দোলন যা বিশ্বের বর্তমান চরম বৈষম্য ও অবিচারকে বৈধতা দেয়, এবং বিশ্বের সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসন্ন জলবায়ু ও পরিবেশগত মহাবিপর্যয়কে মেনে নিতে প্রস্তুত।


লংটার্মিজমের যুক্তি হলো, মানবজাতির মুক্তি এখানে ও এখন আমাদের সমাজকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠনের মধ্যে নয়, বরং ‘নীটশীয় উবারমেনশ’—অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ মানুষের—একটি শ্রেণির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে এই বৈষম্যগুলো আরও তীব্র করার মধ্যেই নিহিত।


একটি ক্ষুদ্র আর্থিক অভিজাত শ্রেণির প্রয়োজন সম্পদ আরও পুঞ্জীভূত করার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা—অবশ্যই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে—যাতে তারা আমাদের ভঙ্গুর গ্রহে টিকে থাকার সমস্যার সমাধান খুঁজে পায়। আমাদের বাকিরা শীর্ষ ধনীদের নিরাপত্তার পথে যাত্রা করার ক্ষমতার জন্য একটি বাধা মাত্র।


সাধারণ নারী, পুরুষ ও শিশুদের ডুবতে থাকা জাহাজে ফেলে দিতে হবে, আর বিলিয়নিয়াররা লাইফবোট দখল করে নেবে।


লংটার্মিজমের অন্যতম গুরু, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের ভাষায়, সামনে যা অপেক্ষা করছে তা হলো, ‘মানুষের জন্য একটি বিশাল গণহত্যা, মানবজাতির জন্য একটি ছোট ভুল পদক্ষেপ।’


ভিডিও গেমিং থেকে একটি শব্দ ধার নিলে, নব্যউদার অভিজাতদের সদস্যরা আমাদের বাকিদের দেখে ‘নন-প্লেয়ার ক্যারেক্টার’হিসেবে—যারা কেবল মূল খেলোয়াড়দের পটভূমি তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত ফাঁকা চরিত্র।

এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে, গাজায় হোক বা কোনো বিলিয়নিয়ারের প্রাসাদে—শিশুরা কষ্ট পেল কি না, তাতে আর কী এসে যায়?


কেউই সৎ নন

এটি যদি প্রচলিত ‘হোয়াইট ম্যান্স বার্ডেন’ ঔপনিবেশিকতার মতো মনে হয়, যা আপাতত পোস্ট-ঔপনিবেশিক যুগের জন্য আধুনিকভাবে আপডেট করা হয়েছে, তবে তা ঠিকই তাই। এটি ব্যাখ্যা করে


কেন নব্যউদারবাদ আরেকটি বিকৃত উপনিবেশবাদী মতাদর্শ—জায়নবাদের—সঙ্গে এত স্বচ্ছন্দে জুটি বাঁধে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জায়নবাদ ক্রমশ আরও বৈধতা লাভ করে, যদিও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়জুড়েই এটি সেই একই ইউরোপীয় জাতিগত জাতীয়তাবাদের বিকৃত যুক্তিকে নির্লজ্জভাবে টিকিয়ে রাখে, যা একসময় নাৎসিবাদের চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছেছিল।


জায়নবাদের অবৈধ সন্তান ইসরায়েল শুধু আর্য শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিচ্ছবি তৈরি করেনি, বরং তার নিজস্ব সংস্করণ—ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ব—কে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।


অন্যান্য কুৎসিত জাতিগত জাতীয়তাবাদের মতোই, জায়নবাদ ‘অপর’-এর বিরুদ্ধে গোত্রগত ঐক্য দাবি করে, সামরিকতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেয়, এবং নিরন্তর ভূখণ্ড সম্প্রসারণ বা ‘লেবেনসরাউম’-এর খোঁজে থাকে।

এতে কি আশ্চর্যের কিছু আছে যে বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার অগ্রগতি—যা বিশেষভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা যেন আর ফিরে না আসে, সে উদ্দেশ্যেই গড়ে তোলা হয়েছিল—উল্টে দেওয়ার কাজটি ইসরায়েলই করেছে? এতে কি আশ্চর্যের কিছু আছে যে ইসরায়েলই বিশ্ববাসীর চোখের সামনে একটি গণহত্যা চালিয়েছে—এবং পশ্চিম কেবল তা থামাতেই ব্যর্থ হয়নি, বরং সক্রিয়ভাবে সেই গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে? এতে কি আশ্চর্যের কিছু আছে যে ইসরায়েলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করা যত কঠিন হয়ে উঠেছে, পশ্চিম তত বেশি দমনমূলক ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে, তার প্রকল্পের বিরোধিতা দমনে?


এতে কি আশ্চর্যের কিছু আছে যে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইসরায়েল যে অস্ত্রব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি ও জনসংখ্যা-নিয়ন্ত্রণ কৌশল তৈরি ও পরিশীলিত করেছে, সেগুলোই পশ্চিমা বিলিয়নিয়ার শ্রেণির কাছে তাকে এত মূল্যবান মিত্র করে তুলেছে—যারা ঘরোয়া পর্যায়ে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায়?


এ কারণেই, সেই যুক্তরাজ্যের হোম সেক্রেটারি, যিনি গাজায় গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে মতপ্রকাশকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, এখন ১৮শ শতকের ‘প্যানপটিকন’ কারাগারের ধারণা পুনরায় চালু করতে চাইছেন— এটি একটি সর্বদৃষ্টি কারাগার, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে। শাবানা মাহমুদের কথায়, তার প্যানপটিকন নিশ্চিত করবে যে ‘রাষ্ট্রের চোখ সর্বদা আপনার ওপর থাকবে’।


প্রায় দুই দশক আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল যে জেফ্রি এপস্টিন একজন শিকারি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধারণা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে যে তিনি কোনো নৈতিক ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি—যৌন বিকৃতির ঘৃণ্য রূপের মাধ্যমে—একটি বিস্তৃত দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্কৃতিকে সংক্ষিপ্ত ও প্রবাহিত করেছেন, যে সংস্কৃতি বিশ্বাস করে নিয়ম বিশেষ মানুষের জন্য নয়, নির্বাচিতদের জন্য নয়, উবারমেনশদের জন্য নয়।


এখন তার সবচেয়ে সহজে বিসর্জনযোগ্য কয়েকজন মিত্রকে আমাদের জবাবদিহির ক্ষুধা মেটাতে বলি দেওয়া হবে। কিন্তু এটা ভুললে চলবে না যে— এপস্টিন সংস্কৃতি এখনও পুরো শক্তিতেই বহাল আছে।


মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত 


[জোনাথন কুক ইসরায়েল-প্যালেস্টাইনিয়ান সংঘাত নিয়ে তিনটি বইয়ের লেখক এবং সাংবাদিকতার জন্য মার্থা গেলহর্ন বিশেষ পুরস্কার বিজয়ী।]

    শেয়ার করুন: