তেলের দাম প্রভাবিত করে সবকিছুকেই

ইরানের একটি তেলের ডিপোতে আগুন জ্বলছে। ছবি: সংগৃহীত
কয়দিন আগেও ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ ডলারের মধ্যে। এখন সেই তেল বিক্রি হচ্ছে ১০৬ ডলারে। এ দাম যদিও ১১৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।
এখানেই শেষ নয় এই জ্বালানি তেলের দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে এই প্রথমবারের মতো তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠল।
পারস্য উপসাগরের দুই পাড়ের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ইরান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরব তেল উৎপাদন করে তা পরিশোধের মাধ্যমে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠায়। সেই অঞ্চলেই এখন চলছে যুদ্ধ।
যুদ্ধের মধ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। আর ইরান প্রতিশোধ নিতে হামলা করছে প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে।
এর কারণে সৌদি আরবের আরামকোর পরিশোধনাগার, কাতারের এলএনজি পরিশোধনাগার বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এছাড়া উপসাগরের অন্যান্য দেশের জ্বালানি অবকাঠামোও ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। ফলে তেল উৎপাদন একেবারেই কমে গেছে।
এদিকে বন্ধ হয়ে গেছে সরবরাহও। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এ পথ হয়ে বিশ্বের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ বিভিন্ন গন্তব্যে যায়।
জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ফলে রকেট গতিতে বাড়ছে তেলের মূল্য। এখন এই দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে। ভুগতে হবে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষকে।
খাদ্য উৎপাদন থেকে পরিবহন— সবকিছুতেই প্রয়োজন জ্বালানি তেল। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত খাতের অন্যতম একটি হচ্ছে পরিবহন খাত। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এ খাতে ভোক্তার খরচ বৃদ্ধি পায়। যার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতে, কমে যায় প্রবৃদ্ধি।
তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় কারখানায়। ফলে উৎপাদিত পণ্য গ্রাহককে কিনতে হয় বেশি দামে। আর দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে গেলে বাড়াতে হয় সরকারি ভর্তুকি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উন্নয়নশীল দেশগুলো।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষিখাতও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাষে অন্যতম উপাদান সার, এই সার উৎপাদনে জ্বালানি লাগে। জমি প্রস্তুতে প্রয়োজন ট্রাক্টর বা কৃষিযন্ত্র, এগুলো চালু রাখতেও প্রয়োজন জ্বালানি। জমিতে সেচ দেওয়া, ফসল তোলা এবং তা গন্তব্যে নিতে পরিবহনের জন্য প্রয়োজন জ্বালানি। অর্থাৎ এই খাত পুরোপুরি জ্বালানি নির্ভর।
এছাড়া বিমান চলাচল এবং সমুদ্রে যাতায়াত এখনো পুরোপুরি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লেই বিমানের টিকিট, আকাশ ও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের ওপর।
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় শেয়ার বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। কমে যায় শেয়ারের দাম। কারণ তেলের দাম বেড়ে গেলে কোম্পানির খরচ বেড়ে যায় এবং লাভ কমে যায়। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে ভয় পান। ফলে বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাপানের শেয়ারবাজারের সূচক ৭ শতাংশ ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শেয়ারবাজারের সূচকের ৭.৬ শতাংশ পতন ঘটেছে। এছাড়া ইউরোপের শেয়ারবাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২২ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ২ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। তবে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে, জ্বালানির দাম হ্রাস মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। মূলত গমসহ বিভিন্ন দানাশস্য, ভোজ্যতেল ও মাংসের দাম বৃদ্ধির কারণে ঘটেছে এই মূল্যবৃদ্ধি। গত মাসে পনিরসহ বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য ও চিনির দাম কিছুটা নিম্নমুখী হলেও তাতে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমেনি। এফএওর খাদ্যপণ্য সূচক ফেব্রুয়ারিতে ১২৫ দশমিক ৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারি মাসে যা ছিল ১২৪ দশমিক ২। অর্থাৎ এক মাসে বেড়েছে ১ দশমিক ১ পয়েন্ট।
রাজনৈতিক অস্থিরতাও দেখা দিতে পারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে। দেখা দিতে পারে বিক্ষোভ। যার ফলে সরকারের পতনও ঘটতে পারে। এর উজ্জ্বল নজির শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে ২০২২ সালের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, চরম মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতির কারণে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। যার কারণে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপাকসে।
মূলত যেসব দেশ আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল তারা দাম বৃদ্ধিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরমধ্যে রয়েছে— ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বাংলাদেশ ইত্যাদি। বৈশ্বিক যেকোনো সংকটে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে এসব দেশে বহু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। কখনো কখনো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিতে হয় কারখানা। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোক্তাদের ওপর।

