আগামীর সময়

জ্বালানি কৌশলেই যুদ্ধে টিকে আছে ইরান?

জ্বালানি কৌশলেই যুদ্ধে টিকে আছে ইরান?

সংগৃহীত ছবি

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে মার্কিন মদদপুষ্ট যুদ্ধ যত বাড়ছে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার অবকাঠামো ও ট্রানজিট রুটগুলো ততই হামলার শিকার হচ্ছে। এতে বাজার ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতা কেবল জ্বালানি তেলের ভৌত সরবরাহেই প্রভাব ফেলছে এমনটা নয়। বরং এই জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল প্রতিটা দেশের বিশাল আর্থিক ও ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করছে।

জ্বালানি-যুদ্ধ কৌশলের প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটে ইরানের খারাগ দ্বীপে অবস্থিত প্রধান তেল শিপিং টার্মিনালে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মধ্য দিয়ে। টার্মিনালটি তেহরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মূল এক্সিট পয়েন্ট। দেশটির জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ সরাসরি আসে তেল বিক্রির আয় থেকে। তাই এই একক রপ্তানি কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা কেবল কৌশলগত হামলা নয় বরং দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রাথমিক উৎসে আঘাত।

ইরানও একইভাবে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল বন্ধ করে পাল্টা জবাব দিয়েছে। এ পথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ আনা-নেওয়া করা হয়। এই পদক্ষেপে সামরিক হস্তক্ষেপ সরাসরি বৈশ্বিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। যানচলাচল বন্ধ হওয়ায় শিপিং সক্ষমতা কমার পাশাপাশি যুদ্ধের ঝুঁকি সংক্রান্ত বিমার খরচও বেড়েছে। এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে জ্বালানির বাজারকে।

সৌদি আরবের শোধন ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে। এই প্রভাব কেবল অপরিশোধিত তেল সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। দেশটির রাস তানুবার মতো শোধনাগারগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি শৃঙ্খলে অন্যতম বাধা বা ‘বটলনেক’। এগুলো যখন হুমকির মুখে পড়ে বা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তখন তেল উৎপাদন অক্ষত থাকলেও ডিজেল এবং জেট-ফুয়েল বাজারে সংকট দেখা দেয়। আর এর প্রভাব হয় তাৎক্ষণিক এবং নির্দিষ্ট পণ্য কেন্দ্রিক।

অন্যদিকে কাতারের এলএনজি স্থাপনায় বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব হয় কিছুটা ভিন্ন। এলএনজি বাজার পাইপলাইন ব্যবস্থার চেয়ে নমনীয় হলেও এর সরবরাহ নির্দিষ্ট কিছু স্থানে হয়ে থাকে। আগামী দশকে কাতার একাই বিশ্বব্যাপী এলএনজি বাজারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দখল করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাই এই বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইতোমধ্যে একই দিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এতে বোঝা যায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটার আগেই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব কতটা তাৎক্ষণিক হতে পারে।

২০২২ সালে রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহে ব্যাপক হ্রাসের পর থেকে ইউরোপ সমুদ্রপথে এলএনজি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এখানে কাতার হলো অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী সাপ্লাইয়ার। ফলে দোহার রপ্তানিতে দীর্ঘস্থায়ী যে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি ইউরোপীয় গ্যাসের ভারসাম্যের পাশাপাশি এশিয়ার প্রধান আমদানিকারকদের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

এই উদাহরণগুলো বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের কাঠামোগত ভঙ্গুরতার চিত্র তুলে ধরে। এমনকি শিপিং খরচ, বিমা খরচ এবং ফরোয়ার্ড কন্টাক্ট বাড়ানোর জন্য হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়াই যথেষ্ট। বিশ্ব গ্যাস বাজারে এটি কৌশলে ঝুঁকি তৈরি করে।

তাছাড়া, এই পরিস্থিতি অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও সরাসরি সংঘাতের দিকে টেনে আনতে পারে। সব মিলিয়ে সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় উৎপাদকরা একটি কৌশলগত দ্বিধার মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে যেমন তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জবাব দিতে ব্যর্থ হলে তা আরও হামলা ডেকে আনতে পারে, আবার যে কোনো ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘায়িত করতে পারে। যাই হোক না কেন, এখানে ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত বেশি। কারণ এই অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো কোনো প্রান্তিক সম্পদ নয়। এগুলো জাতীয় রাজস্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের মূল কেন্দ্র।

বাস্তবিক অর্থে মানতে হয় ইরানের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা সীমিত। হরমুজ প্রণালী একটি গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ পথ। তবে এটি নিবিড়ভাবে টহল দেওয়া হয়। এর সরু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজে সীমিত পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা করলেও চলাচল ব্যহত হতে পারে। তবে উপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌ-উপস্থিতি রয়েছে।

ইরান দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের চেষ্টা করলে এটি তার নিজস্ব নৌ-সম্পদ এবং উপকূলীয় অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা ডেকে আনতে পারে। সেই অর্থে, হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি একটি টেকসই সামরিক কৌশলের পরিবর্তে ঝুঁকির প্রিমিয়াম বাড়ানোর লক্ষ্য হতে পারে। এমনকি যদি চলাচল দ্রুত শুরুও হয়, এই ঘটনাটি প্রমাণ করবে যে বিশাল আর্থিক প্রভাব তৈরি করতে খুব বেশি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয় না।

এর সঙ্গে রয়েছে বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিশ্ব অর্থনীতি ইতোমধ্যেই উচ্চ সরকারি ঋণ, ক্রমাগত মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং অসম প্রবৃদ্ধির ভারে জর্জরিত। উপসাগরীয় রপ্তানিতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত তেল ও এলএনজির দামকে দ্রুত বাড়িয়ে দেবে। যার ফলাফল হবে তাৎক্ষণিক মুদ্রাস্ফীতি।

উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য এর প্রভাব বিশেষ উদ্বেগের। কারণ তাদের মোট আমদানি বিলের একটি বড় অংশই হলো জ্বালানি। ডলারের হিসেবে উচ্চমূল্য এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন মিলে ব্যালেন্স-অফ-পেমেন্ট সংকট এবং সার্বভৌম-ঝুঁকির পুনর্মূল্যায়ন ঘটাতে পারে। কেবল নিকটবর্তী প্রতিপক্ষ নয়, বরং বৈশ্বিক ভোক্তাদেরও প্রভাবিত করে- এমন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে ইরান এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয়কে বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।

উদ্দেশ্যটি কেবল বৈশ্বিক সরবরাহ বন্ধ করা নয় বরং ব্যাপক কূটনৈতিক বা কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করার মতো যথেষ্ট অস্থিতিশীলতা তৈরি করা।

এই কৌশলের অনেক ঐতিহাসিক সাদৃশ্য রয়েছে। ১৯৭৩ সালের ওপেক তেল নিষেধাজ্ঞা পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতিকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠিত করেছিল। ২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় ইরানের আগের হামলাগুলো স্থায়ী ঘাটতি তৈরি না করেই বাজারকে কিছুদিনের জন্য নাড়িয়ে দিয়েছিল। সবশেষ ২০২২ সালের আগে রাশিয়ার গ্যাসের প্রবাহকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা দেখিয়েছিল, কীভাবে জ্বালানি আন্তঃনির্ভরশীলতা দ্রুত ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের উৎসে পরিণত হতে পারে।

বর্তমান সংকট এই প্রতিটি ঘটনার উপাদানগুলো ধারণ করে, তবে এটি আরও বেশি আর্থিকভাবে সংহত এবং দ্রুতগতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উন্মোচিত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক দিনের মধ্যেই মুদ্রাস্ফীতির উপাত্ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক জনসমর্থনের ওপর প্রভাব ফেলবে। এই দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা বিঘ্ন ঘটানোর কৌশলগত মূল্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি সেইসব আঞ্চলিক শক্তির ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয় যাদের নিজস্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

তাই আবারও বলতে হয়, এই উত্তেজনার অর্থনৈতিক যুক্তি দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ বা সরবরাহ ব্যবস্থার বড় কোনো পতনের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে সর্বজনীন দুর্বলতার ওপর। যখন অবকাঠামোর কেন্দ্রীকরণ ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখোমুখি হয়, তখন বাজারগুলো দ্রুত বিভিন্ন অঞ্চলে সেই চাপ ছড়িয়ে দেয়। যদি জ্বালানি অবকাঠামো ক্রমাগত হামলার শিকার হতে থাকে, তবে ঝুঁকি কেবল দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপসাগরীয় জ্বালানি সম্পদে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, বিমা বাজার এবং কূটনৈতিক সমীকরণগুলোকে বদলে দিতে পারে।

চলমান এই উত্তেজনা কেবল সামরিক প্রতিরোধের পরীক্ষাই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক ধাক্কার বিপরীতে কতটা স্থিতিস্থাপক তারই পরীক্ষা। একটি নিবিড়ভাবে আন্তঃসংযুক্ত অর্থনীতিতে, জ্বালানি প্রবাহ যখন ঝুঁকির মুখে থাকে, তখন আঞ্চলিক যুদ্ধগুলো খুব কমই আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতায় থাকে।

    শেয়ার করুন: