আগামীর সময়

যেভাবে ইসরায়েলি নারীবাদ যুদ্ধকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করা হয়

যেভাবে ইসরায়েলি নারীবাদ যুদ্ধকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করা হয়

সংগৃহীত ছবি

চারজন ইসরায়েলি পাইলট তাদের যুদ্ধবিমানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন—চোখে চশমা, হাত আড়াআড়িভাবে ভাঁজ করা; যেন 'টপ গান' সিনেমার পোস্টার। এই চারজন পাইলটই নারী। তাদের হেলমেটের নিচ থেকে লম্বা চুল কাঁধের ওপর এসে পড়েছে।

ছবিটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রচারিত হয়ে আসছে। ইরান ও ফিলিস্তিনের ওপর সাম্প্রতিক সময়ের হামলার দিনগুলোতে এটি আবারও প্রচারণার সামনে নিয়ে আসা হয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য নারী ফাইটার পাইলটদের এই অংশগ্রহণ একটি বড় গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছে: অপারেশন 'রোয়ারিং লায়ন'-এর অংশ হিসেবে ইরানের আকাশে হামলায় অংশ নিচ্ছেন পাইলট ও নেভিগেটরসহ প্রায় ৩০ জন নারী ক্রু সদস্য।

গত রবিবার আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ইসরায়েলি নেতারা এই বার্তাকে আরও জোরালো করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা বেনি গ্যান্টজ একটি ছবি শেয়ার করেছেন যেখানে দেখা যায় একজন নারী পাইলট ইরানের জ্বলন্ত শহরের ওপর দিয়ে উড়ছেন, আর নিচে ইরানি নারীরা 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ করছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বারবার প্রচার করছে যে তাদের ২০ শতাংশের বেশি যোদ্ধা এখন নারী। কিন্তু এই 'নারীবাদ' বা সমঅধিকারের আড়ালে যে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা চলছে, তা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

কিন্তু যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলি যুদ্ধযন্ত্রের হাতে হাজার হাজার নারী ও শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, তখন উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত ফাঁপা শোনায়। গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৩,০০০ নারী ও শিশু নিহত হয়েছে এবং ৭৫,০০০-এর বেশি আহত হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত রিম আলসালেম একে 'ফেমিসাইড' (নারী নিধন) বা নারীদের বিরুদ্ধে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন।

ফিলিস্তিনি নারীরা ইসরায়েলি কারাগারে যৌন সহিংসতা এবং নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। এমনকি গাজায় ইসরায়েলি সৈন্যদের ফিলিস্তিনি নারীদের অন্তর্বাস নিয়ে উপহাস করার ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে।

যখন ইসরায়েলি পার্লামেন্টে নারী সৈন্যদের জন্য আরামদায়ক ইউনিফর্ম নিশ্চিত করার আলোচনা চলছিল, তখন গাজার নারীরা স্যানিটারি প্যাড পর্যন্ত পাচ্ছিলেন না। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২,৬০০ অন্তঃসত্ত্বা নারীর গর্ভপাত ঘটেছে এবং ক্ষুধার কারণে মায়েদের স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়ায় নবজাতকরা মারা যাচ্ছে।

ইরানে ইসরায়েলি নারী পাইলটদের 'গর্বের' অভিযানে নিহতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১৬৫ জনই ছিল শিশু (৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়ে), যারা একটি স্কুলে বোমা হামলায় নিহত হয়েছে।

ইসরায়েলি নারীরা যখন যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণকে 'সমঅধিকার' হিসেবে উদযাপন করেন, তখন তাদের বোমার আঘাতে নিচে থাকা সাধারণ মানুষের মৃত্যু বা ধ্বংসের বিষয়টি আলোচনার বাইরে চলে যায়। ইসরায়েলি নারীবাদ এখন ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যা এবং লেবানন ও ইরানে ধ্বংসলীলাকে স্বাভাবিক করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

ইরানি নারীরা হয়তো সেই ভবিষ্যতের দিকেই এগোচ্ছেন যা গাজার নারীরা এখন ভোগ করছেন। এক ফিলিস্তিনি নারীর ভাষায়: তারা আমাদের ১০০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে।

ইসরায়েল নিজেকে 'নারী-বান্ধব' হিসেবে প্রচার করে ইরান বা গাজার ওপর হামলাকে একটি নারী 'মুক্তির লড়াই' হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের সেই নারী পাইলটদের ছোড়া বোমায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ও ইরানি নারী ও শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। অর্থাৎ, একজনের 'নারীবাদ' বা 'অধিকার' এখানে অন্য প্রান্তের হাজার হাজার নারীর জীবনের বিনিময়ে আসছে।

লেখক:
লুবনা মাসারওয়া : 'মিডল ইস্ট আই'র ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ব্যুরো প্রধান। তিনি জেরুজালেম থেকে তার কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
মহা হুসাইনি : গাজাভিত্তিক একজন পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মী।

    শেয়ার করুন: