‘ডিজিটাল স্বর্ণ’ বিটকয়েনের বড় দরপতনের নেপথ্যে কী?

বিটকয়েনের আচরণ এখন কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ক্রিপ্টোকারেন্সিটি অক্টোবরের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এখন মূল্য হারিয়েছে প্রায় অর্ধেক। বৃহস্পতিবার ১৬ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিটকয়েনের দাম নেমে এসেছে ৬৩ হাজার ডলারের নিচে।
এই পতন আসলে খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। ক্রিপ্টো বাজারের অস্থিরতা সুপরিচিত এবং এর আগেও বিটকয়েন আরও বড় বড় ধসের মুখে পড়েছে।
অদ্ভুত বিষয়টি হলো, চার মাস ধরে চলা এই দরপতন এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন তাত্ত্বিকভাবে বিটকয়েনের পক্ষে সবকিছু থাকার কথা ছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই ক্রিপ্টোপন্থীরা বিটকয়েনকে ‘ডিজিটাল স্বর্ণ’ হিসেবে দেখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে আসছেন—অর্থাৎ, কঠিন সময়ে বিনিয়োগকারীরা যেখানে নিরাপদে অর্থ সংরক্ষণ করতে পারেন, এমন এক বিকল্প নিরাপদ আশ্রয়।
সে হিসাবে, নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ার এই সময়েই বিটকয়েনের দাম বাড়ার কথা ছিল।
চলতি বছরে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার নেতাকে অপসারণের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপ ও কানাডার মিত্রদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অ্যানথ্রপিকের ক্লড এখন আইন ফার্মের জন্য বিভিন্ন কাজ করতে পারছে, যার ফলে সফটওয়্যার খাতের শেয়ারের দাম হঠাৎ কমে গেছে।
বাজারে ভয় সূচকগুলোও সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। সিএনএনের ‘ফিয়ার অ্যান্ড গ্রিড ইনডেক্স’ স্পষ্টভাবে ‘ভয়’ অঞ্চলে রয়েছে। ভিআইএক্স অস্থিরতা সূচকও সাময়িকভাবে নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়—যখন বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক তথ্য ও এনভিডিয়ার আয় প্রতিবেদন নিয়ে বাজারে ছোটখাটো ধস নেমেছিল।
এই ভয়ের পরিবেশ স্বর্ণের দামে রেকর্ড উত্থান ঘটিয়েছে। সম্প্রতি স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্স পাঁচ হাজার ৫০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। স্বর্ণকে চূড়ান্ত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়।
কিন্তু বিটকয়েন সেই পথে হাঁটছে না। সব অনিশ্চয়তার মধ্যেও চলতি বছরে এর দাম কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। এমনকি ‘বিগ শর্ট’ খ্যাত বিনিয়োগকারী মাইকেল ব্যারি সম্প্রতি তার সাবস্ট্যাকে লিখেছেন, স্বর্ণ ও রুপার সাম্প্রতিক অতিরিক্ত অস্থিরতার একটি কারণ হতে পারে—বিটকয়েনের দরপতনে মুখ বাঁচাতে ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীরা ধাতুতে থাকা অবস্থান বিক্রি করে দিচ্ছেন।
বিটকয়েনের এই ধসের ফলে ট্রাম্প-উত্তর ‘ট্রাম্প বাম্প’ পুরোপুরি মুছে গেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রার দাম বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, একসময় ক্রিপ্টোকে অবজ্ঞা করা ট্রাম্প পরে এগুলোকে সমর্থন করেন এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তাহলে এই নতুন ‘ক্রিপ্টো উইন্টারের’ কারণ কী? মূলত, বিটকয়েন আদৌ ‘ডিজিটাল স্বর্ণ’ কি না—এই প্রশ্নে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বাজারে ছড়িয়ে পড়া ‘ঝুঁকি এড়ানোর’ মনোভাবের সঙ্গে বিটকয়েনও তলিয়ে গেছে। ভয় বিনিয়োগকারীদের কেনার প্রেরণা না দিয়ে বরং বিক্রির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অক্টোবরের পর থেকে স্বর্ণের দাম ২৪ শতাংশ বাড়লেও বিটকয়েনের দাম ৫০ শতাংশ কমেছে—এই বৈপরীত্যই সেই ধারণাকে আরও শক্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বুধবার কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ক্রিপ্টো বাজার স্থিতিশীল করার কোনো আইনগত ক্ষমতা ট্রেজারির নেই। তার বক্তব্যও বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি।
বিটকয়েন ইটিএফও প্রত্যাশামতো গতি পায়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হঠাৎ সিদ্ধান্তকে আরও তীব্র করেছে।
তবে বিটকয়েন বিনিয়োগকারীদের জন্য আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। এই ধস নতুন কিছু নয়—এর আগেও এমন হয়েছে।
২০১৪ সালে এমটি গক্স এক্সচেঞ্জ হ্যাক হওয়ার পর ক্রিপ্টোর বড় ধস নেমেছিল। ২০১৮ সালে প্রাথমিক কয়েন অফারিং (আইসিও) নিয়ে আতঙ্কে বিটকয়েনের দাম পড়ে যায় ৭৪ শতাংশ। আবার ২০২১ ও ২০২২ সালে নিয়ন্ত্রণমূলক চাপ ও এফটিএক্স কেলেঙ্কারির পর পর দুবার বড় পতন ঘটে।
প্রতিবারই, প্রায় দেড় বছরের মধ্যে বিটকয়েন ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।

