কর্মজীবী মায়ের অদেখা দ্বিতীয় শিফট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সকালে ঘুম ভাঙার আগেই অনেক কর্মজীবী মায়ের দিন শুরু হয়ে যায়। পরিবারের সকালের নাশতা, সন্তানের স্কুলের প্রস্তুতি, ঘর গুছিয়ে অফিসের জন্য বের হওয়া। এরপর অফিসে সময়মতো পৌঁছে দায়িত্ব পালন, মিটিং, কাজের চাপ, লক্ষ্য পূরণ, সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মেলানো। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, দিনের বড় অংশ এখানেই শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কর্মজীবী মায়েদের জন্য আসল কাজের আরেকটি অধ্যায় তখনও বাকি থাকে।
অফিস শেষে যখন অনেকেই বিশ্রামের কথা ভাবেন, তখন অসংখ্য মা বাড়ি ফেরেন দ্বিতীয় শিফটে যোগ দিতে। রান্নাঘরে রাতের খাবারের প্রস্তুতি, সন্তানের পড়াশোনা দেখা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়া, ঘর পরিষ্কার, পরদিনের প্রস্তুতি, পরিবারের ছোট বড় প্রয়োজন মেটানো। অর্থাৎ বেতনের চাকরি শেষে শুরু হয় অবৈতনিক আরেক চাকরি, যার নির্দিষ্ট সময় নেই, ছুটি নেই, প্রশংসাও অনেক সময় নেই।
অর্থনৈতিকভাবে নারীরা কর্মক্ষেত্রে অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু ঘরের দায়িত্বের ভার এখনো প্রধানত তাদের কাঁধেই রয়ে গেছে। ফলে একজন কর্মজীবী মা শুধু অফিসের কর্মী নন, তিনি একই সঙ্গে রাঁধুনি, শিক্ষক, সেবাদানকারী, পরিকল্পনাকারী, মানসিক সহায়তাদানকারী এবং পরিবারের অদৃশ্য ব্যবস্থাপক।
সমস্যা শুধু কাজের পরিমাণে নয়, কাজের অদৃশ্যতায়ও। অফিসের কাজের মূল্য নির্ধারণ হয় বেতন, পদোন্নতি ও স্বীকৃতিতে। কিন্তু ঘরের কাজকে এখনো অনেক পরিবার 'স্বাভাবিক দায়িত্ব' বলে ধরে নেয়। ফলে একজন মা ক্লান্ত হলেও তার ক্লান্তি দৃশ্যমান হয় না। তিনি সময় দিলেও সেটি আলাদা করে গণনা করা হয় না। তার মানসিক চাপও প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
এর প্রভাব পড়ে শরীর ও মনে। দীর্ঘ সময় কাজ, বিশ্রামের অভাব, নিজের জন্য সময় না পাওয়া, সবকিছু নিখুঁতভাবে সামলানোর চাপ থেকে অনেক মা অবসাদ, উদ্বেগ, ক্লান্তি ও অপরাধবোধে ভোগেন। সন্তানকে সময় দিলে মনে হয় অফিসে কম দিলেন, অফিসে সময় দিলে মনে হয় পরিবারে কম দিলেন। যেন সব জায়গায় নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।
তবে এই চিত্র বদলানো অসম্ভব নয়। পরিবার যদি সংসারকে সবার যৌথ দায়িত্ব হিসেবে দেখে, অনেক কিছুই পাল্টে যেতে পারে। রান্না, বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, ঘর গুছানো শুধু মায়ের কাজ নয়। স্বামী, সন্তান, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দায়িত্ব নেওয়া উচিত। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো দরকার, ঘরের কাজ লিঙ্গভিত্তিক নয়, এটি পারিবারিক দায়িত্ব।
কর্মক্ষেত্রেরও ভূমিকা আছে। নমনীয় কর্মঘণ্টা, মাতৃত্ববান্ধব নীতি, ডে কেয়ার সুবিধা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং সহানুভূতিশীল কর্মপরিবেশ কর্মজীবী মায়েদের জীবন সহজ করতে পারে। একজন কর্মী যখন মা, তখন তিনি কম পেশাদার নন। বরং সময় ব্যবস্থাপনা, ধৈর্য, বহুমুখী দায়িত্ব সামলানো এবং সংকট মোকাবিলায় তিনি অনেক সময় আরও দক্ষ।
আমরা প্রায়ই সফল কর্মজীবী নারীর গল্প বলি, কিন্তু তার প্রতিদিনের অদেখা শ্রমের গল্প বলি না। অফিসে হাসিমুখে কাজ শেষ করে যে নারী রাতে পরিবারের সবার খাবার তুলে দেন, সন্তানের হোমওয়ার্ক দেখেন, অসুস্থ সদস্যের পাশে বসেন, ভোরে আবার নতুন দিন শুরু করেন, তার জীবন শুধু সংগ্রামের নয়, অসাধারণ সক্ষমতারও গল্প।
মা দিবসে ফুল দেওয়া সহজ, প্রশংসার কথা বলা সহজ। কিন্তু সত্যিকারের সম্মান হলো তার শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া, দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, বিশ্রামের অধিকার নিশ্চিত করা। কর্মজীবী মায়েরা দিনে দুই চাকরি করেন, অথচ অনেক সময় দুটির একটিকেও আমরা যথাযথভাবে দেখি না। এখন সময় তাদের দ্বিতীয় শিফটকে দৃশ্যমান করার।




