বিদ্যুৎমন্ত্রী
সৌরশক্তি থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে সরকার

ছবি: আগামীর সময়
আগামী পাঁচ বছরে সৌরশক্তি থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্বে আসার পর দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সৌরবিদ্যুতের প্রসঙ্গটি তুলেছেন। কী উপায়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো যায়, তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছেন আমাদের কাছে।’
আজ সোমবার বিকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন তিনি। ‘রোডম্যাপ টুওয়ার্ডস ১০ হাজার মোগাওয়াট সোলার পাওয়ার, ২০৩০’ শীর্ষক ওই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলছিলেন, ‘বিগত সরকার অর্থ পাচারের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করে রেখেছিল। এ কারণেই এ খাতে এখন ৫৬ হাজার কোটি টাকার দায় হয়ে গেছে, যা বহন করতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। বিগত সরকার সৌরবিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর শর্ত দিয়েছিল। কিন্তু সোলারগুলো বসানো হয়েছিল প্রদর্শনের জন্য, যা কাজে আসেনি। এখন সেখানে ধুলোবালি পড়ে আছে।’
ব্যবসায়িক ও লাভজনক মডেল অনুসরণ করে ঢাকাসহ সারা দেশে ছাদে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য, ‘ঢাকাকে ছয়টি বা আরও কয়েকটি ব্লকে ভাগ করে বিনিয়োগকারীদের দেওয়া গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বেসরকারি পর্যায়ে বিক্রি করবেন তারা। এখানে সরকার হাত দেবে না।’
‘এখন প্রয়োজন হচ্ছে সৌর প্রকল্পকে করমুক্ত ঘোষণা করা। কেউ যদি এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় আসে, তাহলে পাঁচ বছর পর তার কাছ থেকে ইনকাম ট্যাক্স আদায় করতে পারবে সরকার। তাতে কোনো সমস্যা দেখছি না,’ যোগ করেন মন্ত্রী।
বাসাবাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেছেন, ‘কেউ বাসায় নির্দিষ্ট পরিমাণ সোলার বসালে তার হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ বা কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিপ্লব ঘটে যাবে। সরকার নীতি সহায়তা দেবে, এটাই আমাদের পলিসি।’
সরকারি জমিতে সৌর প্যানেল বসানোর পারিকল্পনাও তুলে ধরেছেন তিনি। বলেছেন, ‘রেল মন্ত্রণালয়ের প্রচুর জমি খালি পড়ে আছে। মানুষ দখল করে আছে। সড়ক বিভাগের প্রচুর জমি খালি পড়ে আছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রচুর খাসজমি আছে। এসব জমিতে সৌর প্যানেল বসানোর চিন্তা করছে সরকার।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউর রহমান খান। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান প্রায় ৫ শতাংশ হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রায় ১.৫ গিগাওয়াট সক্ষমতা থেকে দ্রুত ১০ গিগাওয়াটে পৌঁছাতে হবে।’
ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের উদাহরণ বিশ্লেষণ করে প্রবন্ধে দেখানো হয়, দ্রুত সৌর বিদ্যুৎ সম্প্রসারণ সম্ভব হলেও শক্তিশালী গ্রিড ও নীতিগত সহায়তা ছাড়া তা টেকসই হয় না। ভিয়েতনাম দুই বছরে ১৬.৫ গিগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ যোগ করলেও দুর্বল গ্রিডের কারণে বিপুল বিদ্যুৎ অপচয় হয়েছে। অন্যদিকে ভারত প্রতিযোগিতামূলক নিলাম ও ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ অবকাঠামোর মাধ্যমে সৌর বিদ্যুতের খরচ কমাতে সফল হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সোলার হোম সিস্টেম, সোলার সেচপাম্প ও গার্মেন্টস খাতে নেট মিটারিংকে সফল উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয় এতে। তবে জমি সংকট, উচ্চ আমদানি শুল্ক, দীর্ঘসূত্রতা এবং অনুমোদন জটিলতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বর্তমানে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির ওপর উচ্চ শুল্ক বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে বলে উল্লেখ করেন বক্তারা।
প্রবন্ধে রোডম্যাপে কৃষিজমির সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের সমন্বয়, কাপ্তাই লেকে ভাসমান সৌর প্রকল্প, শুল্ক প্রত্যাহার এবং স্মার্ট গ্রিড ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়। এ ছাড়া কমিউনিটি সোলার, গ্রিন বন্ড এবং প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সেমিনারে সঞ্চালনা করেন প্রকৌশলী কে এম আসাদুজ্জামান। এতে বক্তব্য দেন অ্যাব আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন, প্রকৌশলী আ. ন. হ. আখতার হোসেন, আইইবির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান প্রমুখ।




