আগামীর সময়

থুড়থুড়ে বুড়ো হামজা নিজেই নিজের বোঝা

থুড়থুড়ে বুড়ো হামজা নিজেই নিজের বোঝা

উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা

পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে যখন একটি যাত্রীবাহী বাস মুহূর্তের মধ্যে সলিল সমাধিতে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র আমাদের সান্ত্বনা দেয় ‘উদ্ধারকারী জাহাজ আসছে’ বলে। কিন্তু সেই জাহাজ যখন ষাটের দশকের জরাজীর্ণ ‘হামজা’, তখন সেই উদ্ধার অভিযান দৃশ্যত তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ১০ টনের ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ তুলতে গিয়ে যখন ৬০ বছরের বুড়ো হামজার দম ফুরিয়ে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে—এই উদ্ধারকারী বুড়ো জাহাজের স্বাস্থ্য উদ্ধার করবে কে?

বিআইডব্লিউটিএ-র বহরে ‘হামজা’ বা ‘রুস্তম’ নামের যে ধাতব কঙ্কালগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোর আয়ু ফুরিয়েছে বহু আগেই। যে বাসটির ওজন যাত্রী ও মালামালসহ টেনেটুনে ১২ থেকে ১৫ টন, সেটি পানির নিচ থেকে টেনে তুলতেই যখন হামজার নাভিশ্বাস ওঠে, তখন ভাবলে শিউরে উঠতে হয়—কোনো বড় লঞ্চ ডুবলে আমাদের নসিবে কী আছে? ইতিহাস সাক্ষী, পিনাক-৬ বা এমভি নাসরিনের মতো বড় লঞ্চ যখন শত শত প্রাণ নিয়ে তলিয়ে যায়, তখন এই বুড়ো জাহাজগুলো নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কেবল ডিজেল পোড়ানো আর কালো ধোঁয়া ছাড়া জাতিকে আর কিছুই উপহার দিতে পারে না।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগেও আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে একটি জং ধরা ক্রেনের ওপর। যেখানে গভীর সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে আধুনিক সোনার (Sonar) বা রোবোটিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে আমাদের ডুবুরিরা ঘোলা পানির নিচে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হাতড়ে বেড়ান বাসের বডি। আর তীরে দাঁড়িয়ে ‘হামজা’ নামের সেই যান্ত্রিক বৃদ্ধটি ধুঁকতে ধুঁকতে সময়ক্ষেপণ করে। উদ্ধার অভিযানের নামে এই যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিলম্ব, এটি কি কেবলই যান্ত্রিক ত্রুটি? নাকি কর্তৃপক্ষের পকেট ভরার ‘ডিজেল বিলাস’?

বছরের পর বছর ধরে আমরা শুনে আসছি ‘নির্ভীক’ আর ‘প্রত্যয়’ নামের ২৫০ টনি জাহাজের গল্প। কিন্তু কাজের সময় দেখা যায়, সেই জাহাজগুলো হয় সেতুর নিচ দিয়ে পার হতে পারে না, নয়তো ধীরগতির কারণে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে লাশের সারি দীর্ঘ হয়। শেষমেশ সেই ‘বুড়ো হামজা’র জং ধরা ক্রেনই আমাদের ভরসা!

দৌলতদিয়ার পন্টুনগুলো আজ একেকটি মরণফাঁদ। সেখানে কোনো নিরাপত্তা ব্যারিয়ার নেই, নেই কোনো আধুনিক র্যাম্প। আর এই অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত বলি যখন সাধারণ মানুষ হয়, তখন তাদের উদ্ধারে পাঠানো হয় এমন এক জাহাজ যার নিজেরই এখন থাকার কথা ‘আইসিইউ’তে। ১০ টনের বাস তুলতেই যার নাকানিচুবানি দশা, সেই জাহাজ দিয়ে নৌ-নিরাপত্তার দম্ভ করা কেবল হাস্যকর নয়, বরং নিরেট নির্লজ্জতা।

রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন—আর কত প্রাণ ঝরলে পরে এই ‘বুড়ো বিলাস’ বন্ধ হবে? মানুষের জীবনের দাম কি কয়েক গ্যালন ডিজেল আর জং ধরা চেইনের চেয়েও কম? দ্রুততম সময়ে এই সেকেলে উদ্ধারকারী জাহাজগুলো ‘জাদুঘরে’ পাঠিয়ে প্রকৌশলগত উৎকর্ষের ও আধুনিক সক্ষমতা নিশ্চিত না করলে, নৌ-দুর্ঘটনাগুলো আর নিছক দুর্ঘটনা থাকবে না; সেগুলো হবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একেকটি ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’।

সৌহার্দ্য পরিবহণের বাসটি টেনে তুলছে হামজা

হামজার সক্ষমতা ও পুরনো প্রযুক্তি
বিআইডব্লিউটিএ-র উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা সর্বোচ্চ ৬০ টন পর্যন্ত ওজন তুলতে সক্ষম। হামজা নিজে খুব ধীরগতির জাহাজ। এটি মাস্তুল বা ক্রেন নিয়ে চলতে গিয়ে স্রোতের বিপরীতে খুব একটা গতি পায় না। হামজার ক্রেনের তার (Wire Rope) একটি নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। দুর্ঘটনায় নদীর পানিতে তলানো কোনো বাস যদি ৩০-৪০ ফুটের বেশি গভীরে যায় এবং সেখানে পলি জমে যায়, তবে তাতে হামজার ক্রেনের হুক লাগানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
হামজা ১৯৬৫ সালে তৈরি একটি জাহাজ। এর চেয়ে তুলনামূলক আধুনিক ‘প্রত্যয়’ (২৫০ টন ক্ষমতা) বা ‘নির্ভীক’ (২৫০ টন ক্ষমতা) জাহাজের তুলনায় হামজার প্রযুক্তি অনেক সেকেলে।

নদীর পানিতে কোনো বাস পড়ার পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তলদেশের বালু ও পলি বাসের চাকা ও বডির ওপর জমতে শুরু করে, যা বাসটিকে মাটির সাথে ‘জ্যাম’ করে ফেলে। তখন ১০ টনের বাস তুলতে ৬০ টনের বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়। এছাড়া পানির নিচে তীব্র স্রোতে ডুবুরিরা বাসের গায়ে তার বা চেইন বাঁধতে পারেন না।
বাসটি যদি উপুড় হয়ে বা কাত হয়ে পড়ে থাকে, তবে হামজার মতো সক্ষমতার উদ্ধারকারী জাহাজের ক্রেন দিয়ে টানলে বাসের বডি ছিঁড়ে আসার সম্ভাবনা থাকে, যা উদ্ধারকাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

পদ্মার অতলে এক যান্ত্রিক লড়াই
দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে বুধবারের দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও কেন চোখের সামনে তলিয়ে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না—এমন প্রশ্ন ঘুরে ফিরছিল ঘাটে অপেক্ষমাণ স্বজনহারাদের মুখে মুখে। অন্যদিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ এবং ডুবুরি দলের সামনে পদ্মার তলদেশ যেনো এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।

উদ্ধারকাজ তদারকের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, সৌহার্দ্য পরিবহনের তলিয়ে যাওয়া বাসটির মতো একটি ৪০ সিটের বাসের ওজন যাত্রীহীন অবস্থায় প্রায় ৭-৮ টন, আর মালামাল ও পানিসহ এটি ১১ থেকে ১৫ টন ভারী হয়ে ছিল। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, বাসটি যখন নদীর তলদেশের নরম পলিমাটিতে গিয়ে পড়ে, তখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এর চাকা ও বডির একাংশ বালুতে গেঁথে যায়। এই ‘সাকশন ইফেক্ট’ বা কাদার টান বাসটিকে টেনে তোলার জন্য প্রায় ৩০-৪০ টন শক্তির সমান বাধার সৃষ্টি করেছে। যে কারণে বাসটি টেনে উপর তুলতে পেরিয়ে গেছে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময়।
তারা আরও বলেন, পদ্মার তলদেশে স্রোতের গতিবেগ প্রবল। সেকেন্ডে মাত্র ২ মিটার স্রোতও ডুবুরিদের জন্য পাহাড়সম বাধা। এছাড়া পানির তলে ঘোলাটে অবস্থার কারণে দৃষ্টিসীমা (Visibility) ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। ডুবুরিদের কেবল হাতের স্পর্শে বাসের অবস্থান শনাক্ত করতে হয়েছে, যা অন্ধকারের মাঝে সুঁই খোঁজার মতো কঠিন কাজ।

উদ্ধারকারী জাহাজ হামজার ক্ষমতা ৬০ টন হলেও এটি কয়েক দশকের পুরনো প্রযুক্তিতে চলে। তীব্র স্রোতের বিপরীতে জাহাজটিকে স্থির রেখে ক্রেনের বিশাল হুক বাসের ইঞ্জিনের মজবুত অংশে আটকানো ছিল এক দুঃসাধ্য কাজ। ভুল জায়গায় হুক লাগলে বাসের বডি টিনের মতো ছিঁড়ে আসতে পারতো, যা ভেতরে থাকা মানুষদের উদ্ধারের শেষ সুযোগটিও দিতো নষ্ট করে।

দৌলতদিয়ার ওই পয়েন্টে নদীর গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ ফুট। এত গভীরে পানির প্রচণ্ড চাপে ডুবুরিদের বেশিক্ষণ অবস্থান করা সম্ভব হয়নি। বাসটি উপুড় হয়ে পড়ায় এর দরজা বা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকা এবং নিখোঁজদের বের করে আনাও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।

উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ এবং দেশে যেকোনো বড় নৌ-দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার অভিযানের সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বড় কোনো লঞ্চডুবির ঘটনায় হামজার সীমাবদ্ধতা বারবার প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে। হামজার সর্বোচ্চ উত্তোলন ক্ষমতা ৬০ টন, অথচ একটি মাঝারি আকৃতির লঞ্চের ওজনই ২০০ থেকে ৪০০ টন। ফলে বড় লঞ্চডুবির ঘটনায় এটি বারবার নিজেকে ব্যর্থ প্রমাণ করেছে।

চাঁদপুরে ২০০৩ সালে দেশের ইতিহাসে ঘটে ভয়াবহতম এক লঞ্চডুবির (এমভি নাসরিন-১) ঘটনা। যাতে প্রাণ যায় অন্তত ৪৫০ জনের। এই দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধারকাজে হামজা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। লঞ্চটি এত গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল যে হামজার ক্রেন সেখানে পৌঁছাতেই ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত লঞ্চটি আর উদ্ধারই করা যায়নি।

২০১৪ সালে কাওড়াকান্দি-মাওয়া রুটে আড়াইশর বেশি যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ উদ্ধারে পাঠানো হয় হামজা ও রুস্তমকে। কিন্তু তীব্র স্রোত আর গভীরতার কাছে ৬০ টনের হামজা ছিল পুরোপুরি অসহায়। কয়েকদিন চেষ্টার পরও তলিয়ে যাওয়া লঞ্চটি শনাক্ত করতে না পডারায় উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

পাটুরিয়ায় ২০১৫ সালে ৭০ জন যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া এমভি মোস্তফা লঞ্চটি উদ্ধারে হামজা গিয়ে পৌঁছাতে অনেক দেরি করে। পরে এটি লঞ্চটিকে টেনে তীরে আনতে পারলেও পানির নিচ থেকে পুরোপুরি তুলতে হিমশিম খেয়েছিল।

রাজধানী ঢাকায় ২০২০ সালে (শ্যামবাজার) মর্নিং বার্ড লঞ্চটি যখন বুড়িগঙ্গায় ডুবে যায়, তখন হামজা উদ্ধারকাজ শুরু করতে গিয়ে উল্টো বিপত্তি ঘটায়। উদ্ধার অভিযানের এক পর্যায়ে হামজার চেইন ছিঁড়ে উদ্ধারকাজ দীর্ঘায়িত হয়েছিল।

দেশে বর্তমানে হামজা ছাড়াও রুস্তম, নির্ভীক এবং প্রত্যয় নামে আরও তিনটি উদ্ধারকারী জাহাজ রয়েছে। তবে সেগুলোরও প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে।

হামজার মতোই ৬০ টন ক্ষমতার রুস্তমও অত্যন্ত পুরনো এবং এর ইঞ্জিনের ক্ষমতা সীমিত। তীব্র স্রোতের বিপরীতে এটি চলতে পারে না। এটি মূলত ছোট ফেরি বা ট্রাক উদ্ধারে ব্যবহৃত হয়, বড় লঞ্চের জন্য এটি অকেজো।

২০১৩-১৪ সালে নির্ভীক ও প্রত্যয় নামের ২৫০ টন করে ক্ষমতার দুটি আধুনিক জাহাজ যুক্ত হয় বিআইডব্লিউটিএ-র বহরে। এদের ২৫০ টন ওজন তোলার সক্ষমতা থাকলেও কিছু প্রায়োগিক সমস্যা রয়েছে। এই জাহাজগুলো উচ্চতায় অনেক বড় হওয়ায় বর্ষাকালে বা জোয়ারের সময় বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যার নিচু সেতুগুলোর নিচ দিয়ে পার হতে পারে না। ফলে অনেক সময় দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে এগুলোকে কয়েকশ কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হয়। যা দীর্ঘ করে লাশের মিছিল। এগুলো নিজস্ব ইঞ্জিনে খুব ধীরগতিতে চলে (ঘণ্টায় মাত্র ৮-১০ কিমি)। ফলে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক সময় ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে যায়, যা উদ্ধার তৎপরতাকে ব্যর্থ করে দেয়।

এছাড়া এই জাহাজগুলোর ড্রাফট (পানির নিচের অংশ) বেশি হওয়ায় অনেক সময় নদীর চরে আটকে যায়, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে।
সবমিলিয়ে এটা বলা যায় যে এখনো আমরা ৬০ বছরের পুরনো উদ্ধারকারী জাহাজের ওপর নির্ভরশীল। উদ্ধারকারী জাহাজগুলো ঢাকা বা মাওয়ায় অবস্থান করে। উত্তরবঙ্গ বা দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে এসব জাহাজ পৌঁছাতে পৌঁছাতে লাশের সারি দীর্ঘ হয়।

পানির নিচে উদ্ধারকাজের রিমোট অপারেটেড ভেহিকেল

রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবও। পানির নিচে নিখুঁতভাবে দেখার জন্য ‘সাইড স্ক্যান সোনার’ (Side Scan Sonar) বা শক্তিশালী রিমোট অপারেটেড ভেহিকেল (ROV) এর সংকট রয়েছে, যা উন্নত দেশগুলোতে তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত হয়।

দৌলতদিয়ার পন্টুন থেকে যখন ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের’ বাসটি অতল পদ্মায় তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমাদের উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ হয়তো তার জং ধরা ইঞ্জিন সচল করার কসরত করছিল। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌ-রুটে ৫০ জনের মতো মানুষের জীবন যখন সুঁতোয় ঝুলে থাকে, তখন আমাদের ভরসা করতে হয় ১৯৬৮ সালে তৈরি ৬০ বছরের পুরনো এক জরাজীর্ণ জাহাজের ওপর। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং আমাদের নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

আধুনিক ‘সোনার’ প্রযুক্তি কিংবা ‘রিমোট অপারেটেড ভেহিকেল’ যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশ তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজে ব্যবহার করছে, তখন আমাদের ডুবুরিরা ঘোলা পানির নিচে হাতের স্পর্শে বাসের বডি খুঁজে বেড়ান—এই দৃশ্য কেবল মধ্যযুগীয় নয়, বরং চরম অবমাননাকর।

ঈদের ছুটি শেষে কুমারখালীর নানাবাড়ি থেকে ফেরার পথে সলিল সমাধি হওয়া শিশুটির স্বপ্ন আজ পদ্মার পলিমাটির নিচে চাপা পড়েছে। এই দায় কার? যদি প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কেবল ‘তদন্ত কমিটি’ আর ‘উদ্ধারকারী জাহাজের ধীরগতি’ আমাদের নিয়তি হয়, তবে বুঝতে হবে—আমরা আসলে নদী থেকে হতাহতদের উদ্ধারের চেষ্টা করি না, বরং রাষ্ট্রযন্ত্র তার সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার দায়ভারকেই যেনো নদীর অতলে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আর কত প্রাণের বিনিময়ে আমাদের টনক নড়বে, সেই প্রশ্ন আজ উত্তাল পদ্মার ঢেউয়ে আছড়ে পড়ছে বারবার।

    শেয়ার করুন: