ঈদ সবার জন্য ঘরে ফেরার নয়

ছবি: আগামীর সময়
কমলাপুর বাস কাউন্টার। অস্বাভাবিক ভিড়, তার ওপর বৃষ্টি। এরই মধ্যে মায়ের ব্যাগ গাড়িতে টেনে তুলছেন মাঈনুদ্দিন আহাম্মেদ। মায়ের সঙ্গে বাবাও রয়েছেন। বাস ছেড়ে যাওয়ার খানিক আগে মাঈনুদ্দিন বাস থেকে নেমে এলেন। তবে চলে গেলেন না। বাসের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। এদিকে জানালা দিয়ে মাও দেখছেন ছেলেকে। একটু একটু করে এগোচ্ছে বাস, একসময় চলে গেল অনেক দূরে। তবু সন্তান তাকিয়ে রইলেন যতক্ষণ দেখা যায়।
মাঈনুদ্দিনের এবার ছুটি মেলেনি। এমন এক বেসরকারি চাকরি করেন, যেখানে সব ঈদে ছুটি মেলে না। অবশ্য তিনি একা নন, ঢাকা শহরে এমন অনেক মাইনুদ্দিন রয়েছেন, যাদের ঈদে ছুটি হয় না। বিশেষ করে বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠানের ছোট পদের কর্মীদের ঈদ বলে থাকে না কিছু। ঈদ মানে তাদের কাছে ঘরে ফেরা নয়; বরং নিয়মিত দায়িত্ব পালন। তারা যেন চলেন স্রোতের বিপরীতে। ঘরে ফেরার ঢলে ঠাঁই হয় না তাদের।
উৎসবের মৌসুম এলে বাস, ট্রেন আর লঞ্চ টার্মিনালে দেখা মেলে এদের। গতকাল সোমবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে কথা হলো আসিফ রহমানের সঙ্গে। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে একতা এক্সপ্রেসে তুলে দিতে এসেছেন। টিকিট না থাকায় ভেতরে ঢুকতে পারলেন না। একজন কুলি ডেকে ব্যাগগুলো তুলে দিয়ে স্টেশনের প্রবেশমুখ থেকেই নিলেন বিদায়।
কেন বাড়ি গেলেন না জানতে চাইলে মৃদু হেসে বললেন, ‘পরিবারের সবাই বাড়ি যাচ্ছে। আমার অফিস ঈদের পরদিনও খোলা। তা ছাড়া ঈদের সময় পুরো ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়, বাসায় চুরি-ডাকাতির একটা ভয় থাকে। সব মিলিয়ে আমিই থেকে গেলাম। খারাপ লাগছে; কিন্তু কী আর করা!’ একই দৃশ্যের দেখা মিলল গাবতলী বাস টার্মিনালে। সাভারের একটি পোশাক কারখানার মধ্যমসারির কর্মচারী মশিউর রহমান। বৃদ্ধ মা এবং ছোট বোনকে বাসে তুলে দিচ্ছিলেন। মশিউরের ছুটি মিলেছে মাত্র দুদিন। এই অল্প সময়ে উত্তরাঞ্চলের যানজট ঠেলে বাড়ি গিয়ে আবার ফিরে আসা অসম্ভব। তাই পরিবারের অর্ধেক অংশকে বাড়ি পাঠিয়ে নিজে থেকে যাচ্ছেন ঢাকায়।
মশিউর বলছিলেন, ‘মা একলা যেতে চাচ্ছিলেন না; কিন্তু জোর করে পাঠালাম। গ্রামের বাড়িতে সবার সঙ্গে ঈদ করলে ওনারা আনন্দ পাবেন। আমি না হয় ঈদের দিন বন্ধুদের সঙ্গে কাটিয়ে দেব।’
পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকেই পোশাক খাত, নিরাপত্তাকর্মী, হাসপাতাল এবং জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ঈদের দিনেও কাজ করতে হয়। ফলে তারা অনেক সময় একাই কাটান ঈদের দিন। তা ছাড়া ঈদে যাতায়াত খরচ অন্য সময়ের তুলনায় বেশি হয়। ফলে পরিবারের সবার যাওয়া-আসার খরচ অনেকের হিসাব খরচের বাইরে চলে যায়।
সায়েদাবাদ টার্মিনালে স্ত্রী-সন্তানদের বাসে তুলে দিতে এসেছিলেন সাইদ হোসেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমার যাওয়া নিয়ে আগে থেকেই অনিশ্চিত ছিল। পরে আবার পাঁচটি টিকিটের জায়গায় তিনটি পেয়েছি। পরিবারের সবাই গেলে টিকিট খরচ আরও বেড়ে যেত। এবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় কোরবানিও দিতে পারব না। তার চেয়ে ঢাকাতেই থাকি।’






