টিআইবির পর্যবেক্ষণ
সরকারের ১০০ দিন আইনশৃঙ্খলা ছিল ‘উদ্বেগজনক’

সংগৃহীত ছবি
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১০০ দিনে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, এ সময়ের মধ্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বাড়লেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগ তৈরি করছে।
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক টিআইবির এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই পর্যবেক্ষণ। গতকাল রবিবার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানালেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তবে তিনি এটাও যোগ করলেন, ‘শুধু ১০০ দিনের কার্যক্রম দিয়ে একটি সরকারকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। তবে এই ১০০ দিনের পর্যবেক্ষণ সামনের দিনের পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।’
ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে টিআইবি বলছে, বর্তমান সরকারের আমলেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অব্যাহত। ঢাকায় সংঘটিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ৪০ শতাংশই কিশোর। পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও বিভিন্ন হাটবাজার, পরিবহন খাত, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজি, মাদকব্যবসা, চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা লক্ষণীয় মাত্রায় বিদ্যমান। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কার্যকরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বিভিন্ন স্থানে মাজার এবং ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং ক্ষমতাসীন দলের এক নেতাকে নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা করার জেরে একজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও উঠে এসেছে টিআইবির পর্যবেক্ষণে।
গবেষণায় বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ মের বিভিন্ন তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের ১০০ দিনের মধ্যেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিশন গঠনে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতের কাজ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে মার্চ ও এপ্রিল মাসে ৯০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাই হয়েছে ২৯৪টি এবং ৬০৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ৩টি দাঙ্গা, ১৯৬টি অপহরণের ঘটনাও আছে। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ এবং ধর্ষণের শিকার শিশু ৪৯ থেকে ৭১ জন।
সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জলবায়ু, শিক্ষা খাত, বিচার বিভাগ, কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য খাত, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে টিআইবি।
টিআইবি বলছে, বর্তমান সরকারের আমলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কোনো কারণ উল্লেখ না করে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজনকে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে। একে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পরিপন্থী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের আমলেও সাংবাদিক নির্যাতন অব্যাহত আছে উল্লেখ করে টিআইবি বলছে, ১০০ দিনে ১৩৩টি ঘটনায় ১৮৮ সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১২ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলায় সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। একটি গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গণমাধ্যম অফিসে বিক্ষোভ করার ঘটনাও উঠে এসেছে টিআইবির পর্যবেক্ষণে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ‘হয়রানিমূলক মিথ্যা’ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অনেক সাংবাদিকের জামিন না হওয়ার অভিযোগ পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছে টিআইবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনা করায় একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননার অভিযোগেও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে বলে টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
ইতিবাচক পদক্ষেপ
সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপের তথ্যও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে— সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট নেওয়ার বিশেষ সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর চলাচলে ভিভিআইপি প্রটোকল ও বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা না নেওয়া, জ্বালাননিসহ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ বাসভবন ব্যবহার না করার বিষয়গুলো উঠে আসে।
আরও বলা হয়, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের প্রটোকল দিতে ডিসি-এসপিদের উপস্থিতির চর্চা বাতিল করা। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি; একটি দেশে পাচার করা সম্পদ জব্দ। সরকারি কর্মচারীদের সকাল ৯টায় কার্যালয়ে উপস্থিত ও প্রথম ৪০ মিনিট অন্য কোনো কাজে কার্যালয়ের বাইরে না যাওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ও দপ্তর ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, প্রধানমন্ত্রীর সকাল ৯টায় মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত এবং তদারকির কথাও।
নিজ মন্ত্রণালয়ে দৃশ্যমান সাফল্য প্রমাণে ব্যর্থ বা গাফিলতি প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা এবং ছয় মাস পর কাজের অগ্রগতি মূল্যায়নের ঘোষণাকে ইতিবাচক বলছে টিআইবি।
এ ছাড়া কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রধানদের ভাতা, ক্রীড়াবিদদের কার্ড ও ক্রীড়া ভাতা প্রদান কার্যক্রমকেও ইতিবাচক মনে করছে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন মো. জুলকারনাইন, রাজিয়া সুলতানা ও মো. সহিদুল ইসলাম




