‘এই জিনিস মানুষকে পশু বানায়’: বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার ও জীবন ধ্বংসের চিত্র

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেটালফ্রিকের (ছদ্মনাম) দৈনন্দিন সময় কাটত তার প্রিয় পোষা পাখির যত্ন নিয়ে। কিন্তু ৪০ পেরোনো ঢাকার এই বাসিন্দার এখন আর নিজের খেয়াল রাখার অবস্থা নেই। তার জীবনের চিত্র বদলে দিয়েছে একটি নাম— ইয়াবা। মেথঅ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মারাত্মক মাদক ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশের অসংখ্য তরুণের জীবন। মেটালফ্রিক বলছিলেন, ‘এই জিনিসটা আমার মস্তিষ্ককে পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে।’
মিয়ানমার থেকে চোরাচালান হয়ে আসে এই মাদক। থাই ভাষায় ইয়াবা মানে ‘পাগল ওষুধ’। বাংলাদেশে এই নেশায় আসক্ত লাখ লাখ মানুষ। দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের অন্তত ৫ শতাংশ বা ৮৭ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত।
চলতি বছরের জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সতর্ক করে জানিয়েছেন, সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক ড্রাগের আগ্রাসন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জাতীয় সংসদে সম্প্রতি মাদকসংক্রান্ত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রেখে বিলও পাস হয়েছে।
২০১৮ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ চলাকালে আড়াই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থাগুলো একে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে উদ্বেগ জানিয়েছিল। এতকিছুর পরও ইয়াবার ব্যবহার কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং বেড়েই চলেছে।
ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান জানিয়েছেন, মাদকাসক্তি কমাতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার মান বৃদ্ধি জরুরি। পুরো দেশে মাত্র ৩৫০ জনের মতো সাইকিয়াট্রিস্ট (মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ) রয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে এক ঘণ্টায় ২০ জন রোগী দেখা অসম্ভব হলেও তাদের বিকল্প নেই। তিনি সরকারি প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গেই মানসিক স্বাস্থ্যকে যুক্ত করার তাগিদ দেন। তার মতে, বিষণ্নতা বা উদ্বেগের কারণে অনেকে স্বস্তির খোঁজে মাদক গ্রহণ করা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে খরচ চালাতে গিয়ে অনেকে নিজেরাও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের সীমানা ঘেঁষা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ ইয়াবা উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস। এর মধ্যে মিয়ানমারই বাংলাদেশে ইয়াবা সরবরাহের মূল কারিগর। সম্প্রতি আফিম দুর্লভ হয়ে পড়ায় পুরো বাজার দখলে নিয়েছে ইয়াবা। এমনকি ঢাকার মোহাম্মদপুরের মতো এলাকাগুলোতে দিনদুপুরে খুদে বিক্রেতাদের কাছ থেকে রিকশাচালকদের ইয়াবা কেনার দৃশ্য দেখা যায়।
মেটালফ্রিকের ভাষ্যমতে, বর্তমানে দুই ধরনের ইয়াবা বাজারে মেলে— কম দামি ও দামি। কম দামিগুলো মুখ ও দাঁত দ্রুত নষ্ট করে দেয় আর নিয়মিত সেবনে স্ট্রোক বা খিঁচুনি শুরু হয়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তাও তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
নিজের ধ্বংসের দিকে ইঙ্গিত করে মেটালফ্রিক আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘ইয়াবা মানুষকে একটা মিথ্যা আত্মবিশ্বাস দেয়। কিন্তু সত্য এটাই যে, এটি একটা স্লো পয়জন, যা ব্যক্তি ও তার পরিবারকে নীরবে ধ্বংস করে দেয়।’




