অস্পষ্টতা নিয়ে শুরু মালয়েশিয়া শ্রমবাজার, পদে পদে গোপনীয়তা
- নিয়োগপত্র সত্যায়নের এক দিন পর বলা হলো পরীক্ষামূলক
- কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো অন্ধকারে বোয়েসেল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অনেক বিষয়ে ‘অস্পষ্টতা’ রেখেই শুরু হয়েছে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া। গত সোমবার একটি এজেন্সির দেওয়া ২৮ বাংলাদেশি কর্মীর নিয়োগপত্র বা ডিমান্ড লেটার সত্যায়ন (অ্যাটেস্টেশন) করেছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন আগামীর সময়কে।
একজন কর্মকর্তা বললেন, ‘বিষয়টি প্রকাশের পর কনফিউশন ক্রিয়েট (বিভ্রান্তি সৃষ্টি) হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর তারা অ্যাটেস্টেশন দিয়েছে। ২৯ তারিখ (মঙ্গলবার) চিঠিতে বলা হয়েছে, পরীক্ষামূলক। কিন্তু এটি পরীক্ষামূলক নয়, এটি অ্যাকচুয়ালি (বাস্তবে)।’
তবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলেছে কি না, তা স্পষ্ট না করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা গণমাধ্যমসহ এটি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের নিয়ে দু-এক দিনের মধ্যে একটি গোলটেবিল কনফারেন্স করব। সবার মতামত নিয়ে আমরা কীভাবে যাত্রা শুরু করব, কোথাও কারও পরামর্শ আছে কি না দেখব।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাবনা রয়েছে আগামী সপ্তাহে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বৈঠকটি হওয়ার।
অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বছর বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়া নিয়ে অস্পষ্টতা কাটছে না। বিশেষ করে, কোন খাতে এবং কবে থেকে কর্মী পাঠানো যাবে— তা নিয়ে সরকার কোনো নির্দেশিকা দেয়নি। সাধারণত এসব নির্দেশিকায় পুরো প্রক্রিয়ার বৈধতা, দায়িত্ব ও খরচের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে ‘অতি-গোপনীয়তা’।
সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স পাঠানো দেশ মালয়েশিয়া। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। ২০১৮ ও ২০২৪ সালে সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত ফির অভিযোগে স্থগিত হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া হিসেবে ২১ আগস্ট বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)। পরে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বোয়েসেল) যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে সহযোগী করা হয় ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে।
পাঁচ সদস্যের তদারকি কমিটি: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণ কার্যক্রম ইস্যুতে মন্ত্রণালয় ও আওতাধীন সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে পাঁচ সদস্যের সমন্বয় ও তদারকি কমিটি। গত বুধবার উপসচিব মো. আনিছুর রহমানের স্বাক্ষরিত চিঠিতে জারি করা হয়েছে এই আদেশ। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ ও সদস্য সচিব করা হয়েছে উপসচিব হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডলকে। কমিটির অন্য তিন সদস্য হলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হাফিজুর রহমান চৌধুরী, বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকত আলী ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অতিরিক্ত পরিচালক মো. শরিফুজ্জামান।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণ কার্যক্রম অধিকতর স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহির আওতায় আনার লক্ষ্যে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
এখনো ‘জানে না’ বোয়েসেল: সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বলেছিল, বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে ‘জিরো কস্টে’ নিতে সম্মত হয়েছে। বোয়েসেলের মাধ্যমে প্রথম ব্যাচ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানো হবে এবং এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যাবে।
কিন্তু গত বুধবার পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চিঠি পায়নি বলে জানিয়েছেন বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকত আলী। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কাছে এখনো কোনো চিঠি আসেনি। আমরা গতবারের (২০২৪) আটকে পড়া লোকজনকে এখনো পাঠাচ্ছি।’
জানা গেছে, গত ২১ আগস্ট মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস বাংলাদেশের ২৫ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করার পর এজেন্সিগুলো বসে নেই। তারা টাকা দিয়ে ডিমান্ড লেটার কিনছে। কিন্তু বোয়েসেল সেভাবে কাজ আনতে পারছে না। মালয়েশিয়ার যে কোম্পানি জিরো কস্টে কর্মী নেবে, তারা চাহিদা দিলেই বোয়েসেল থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হবে।
প্রশ্নবিদ্ধ পুরো প্রক্রিয়াটিই: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মূল কারণ হলো তাড়াহুড়ো। প্রক্রিয়াটি আগে ঠিক করে, পরে শ্রমবাজার চালু করলে সেটি নিশ্চিতভাবে স্বচ্ছ বলা যেত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সরকার যেন যেকোনো মূল্যে দ্রুত বাজার চালু করে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিতে চায়— বিশেষ করে এটি প্রমাণ করতে যা আগের সরকারের আমলে সম্ভব হয়নি, বর্তমান সরকার তা পেরেছে।’ এর চেয়ে ধীরগতিতে গিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া তৈরি করা উচিত বলে মনে করেন আসিফ মুনীর।
তিনি আরও বললেন, এই প্রক্রিয়া তৈরির সময় উচিত সব অংশীদারকে সম্পৃক্ত করা— যেমন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ, এনজিও, রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধি, শ্রমিক সংগঠন ও গণমাধ্যম। এখন দেখা যাচ্ছে, আলোচনার পর্বে বেসরকারি মহলকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না; সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এককভাবে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকার। অথচ স্বচ্ছতা আনতে হলে এই আলোচনায় সব পক্ষকে যুক্ত করা জরুরি।



