পররাষ্ট্রমন্ত্রী
রপ্তানি ধরে রাখতে নামতে হবে কঠোর প্রতিযোগিতায়

ছবি : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নামতে হবে কঠোর প্রতিযোগিতায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে এবং এর পরিধি বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়ে কাজ করাও জরুরি— বলছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
আজ শনিবার রাজধানীতে ‘রোডম্যাপ টু ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি কনফারেন্স’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেন ড. খলিলুর। তুলে ধরেন বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাবের কথা। একই সঙ্গে এসব চ্যালেঞ্জ সুযোগে রূপান্তর করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন করে গুরুত্বারোপের আহ্বানও ছিল তার কণ্ঠে।
যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, উন্নয়ন সহযোগী এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নবনির্বাচিত সভাপতি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোয় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইতিবাচক হলেও সেটির গতি মাঝারি পর্যায়ে। এতে কমে আসতে পারে ভোক্তা চাহিদা। প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানিতেও।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এমন একসময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি নানামুখী সংকটে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা, জলবায়ুঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন।
তার ভাষ্য মতে, চলমান জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে নতুন মাত্রার জটিলতা। এসব বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বাংলাদেশ। কারণ জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এগুলোর গভীর প্রভাব রয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘বৈশ্বিক আর্থিক বাজার ও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উৎপাদন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে মূলধন সংগ্রহ করা। ঋণের জন্য অনেক বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। বাজার ওঠা-নামার কারণে আমরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছি।’
তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত দেশগুলো সাধারণত ১ থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারে। অথচ উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অনেক সময়ই ঋণের জন্য গুনতে হয় ৬ থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি সুদ। ফলে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ অর্থায়নে আমাদের প্রবেশাধিকার এখনো সীমিত।
জলবায়ু ঝুঁকি ও অর্থায়নের সংকটের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যোগসূত্রের কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি সতর্ক করেন, চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমদানি করা জ্বালানির পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় এরই মধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদন খরচ ও সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা। জ্বালানির উচ্চমূল্য উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে সম্পদ অন্য খাতে সরিয়ে নিতে পারে। এতে অর্থনীতিতে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানাচ্ছিলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই সংকটের প্রভাবে ১৯৮০-এর দশকে অনেক উন্নয়নশীল দেশকে উন্নয়নের ‘হারানো এক দশক’ পার করতে হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কৃষি আধুনিকীকরণ ও মুক্তবাজার নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
‘বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী চিন্তাভাবনা তিনটি কৌশলগত লক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত— ‘স্থিতিশীলতা, সংস্কার এবং অগ্রগতি’, যোগ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কূটনীতিতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেন।


