অফিসের সময় কমিয়ে, দোকান-শপিংমল বন্ধ করে কতটা সাশ্রয় হবে?

সংগৃহীত ছবি
সরকার অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল নয়টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে- এমন প্রশ্ন উঠেছে এখন। আলোচনায় আসছে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকান-শপিংমল বন্ধের সিদ্ধান্ত।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সাশ্রয়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বাংলাদেশকেও। বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে এসব সিদ্ধান্ত।
সে অনুযায়ী ব্যাংকের লেনদেন চলবে সকাল নয়টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত এবং চারটায় বন্ধ হয়ে যাবে ব্যাংক। দোকানপাট ও শপিংমলসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিক্রিয়া হয়েছে দোকান মালিকসহ ব্যবসায়ীদের মধ্যে। দোকান মালিকসহ ব্যবসায়ীরা সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেরা আলোচনা করবেন এবং শনিবার বসার কথা রয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গেও।
আগামী তিন মাস সরকারি ব্যয় কমানো এবং এ সময়ে কোনো নতুন যানবাহন (গাড়ি, জলযান, আকাশযান) ও কম্পিউটার সামগ্রী না কেনার কথাও বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এছাড়া জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। সেইসাথে, বিয়ে বা উৎসবে কোনো আলোকসজ্জা করা যাবে না বলে জানিয়েছে সরকার।
‘কিছু জ্বালানি সাশ্রয় হবে’
কর্মঘণ্টা কমিয়ে এবং সন্ধ্যায় দোকানপাট বন্ধ করে কিছুটা কমবে বিদ্যুতের ব্যবহার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে এমন সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশে এই প্রথম নেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। এর আগেও একাধিকাবার নানামুখী সংকটে এমন পথে হেঁটেছে সরকার।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে ২০২২ সালের জুনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রাত আটটার পর থেকে দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলো সেই সরকার। সে সময়ও প্রশ্নের মুখে পড়েছিল ওই পদক্ষেপ।
অবশ্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলছিলেন, কিছু জ্বালানি সাশ্রয় হবে। আমরা কখনো কখনো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করি, তাই বাঁচবে ফার্নেস অয়েল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে সাশ্রয় নির্ভর করে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর। কারণ অফিসের সময় কমলেও বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়তে পারে, আবার প্রতিষ্ঠানগুলো কম সময়ে বেশি চাপ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নাও কমাতে পারে বিদ্যুতের ব্যবহার।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, ‘এটি যথাযথভাবে পালিত হলে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লাভ হবে। কিন্তু এগুলো সাধারণত সুফল আনতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে সরকারের সফলতার হার খুব বেশি না।’ তার মতে, কর্মঘণ্টা কমানোর বদলে নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে তা বেশি কার্যকর হতে পারতো।
‘সরকার যদি প্রতিটি অফিসকে নির্দিষ্ট টার্গেট দিতো যে প্রতিদিন বা মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে, তাহলে সেটি অফিস ম্যানেজমেন্টের অংশ হয়ে যেতো। এখন যেটা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। ফলে এর বাস্তবায়ন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই কর্মঘণ্টা কমলেও হবে না সাশ্রয়। দোকানপাটের জন্যও একই বিষয় প্রযোজ্য,’- বলছিলেন শামসুল আলম।
আওয়ামী লীগ শাসনের সময় ২০২২ সালে যে বিদ্যূৎ সাশ্রয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সে প্রসঙ্গ টেনে শামসুল আলম বলেছেন, ওইসময় সংকট নিরসনে লোডশেডিং দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ কোন জায়গায় কত লোডশেডিং দিবে, তা পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি। অর্থাৎ, ঠিকঠাক পরিকল্পনা না করে লোডশেডিং দিলে সেটিও বয়ে আনবে না সুফল।
সরকারের সাথে বসবেন দোকান মালিকরা
অফিসের সময় কমলেও ঠিকঠাক কর্মপরিকল্পনা করলে এটি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু দোকানপাট সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে খুচরা ব্যবসায়। কারণ সাধারণত বিকেল ও সন্ধ্যার সময়ই বেশি থাকে ক্রেতার চাপ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেছেন, দোকানপাট ছয়টার মধ্যে বন্ধ করে দিলে তা ব্যবসায়ীদের জন্য কষ্টসাধ্য বিষয় হবে। দিনে দোকান খুলে দিনেই বন্ধ করে দিলে তো ক্ষতির শেষ থাকবে না আমাদের।’

