পোশাক নিয়ে মন্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ, আপত্তির মুখে এক্সপাঞ্জ
- পুশইন নিয়ে আলোচনা স্থগিত হওয়ায় ক্ষোভ

বক্তব্য দিচ্ছেন কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। সংগৃহীত ছবি
জামায়াতে ইসলামীর নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও পর্দা নিয়ে সরকারদলীয় এক এমপির মন্তব্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদ। কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর এ-সংক্রান্ত একটি বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক হইচই ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয় সংসদে। পরে বিরোধী দলের আপত্তির মুখে এ-সংক্রান্ত বক্তব্য এক্সপাঞ্জ (কার্যবিবরণী থেকে বাদ) করা হয়।
আজ রবিবার জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় এ ঘটনা ঘটে। এদিকে সংসদে অবৈধ পুশইন নিয়ে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জামায়াতের এক এমপি।
সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরী তার বক্তব্যের একপর্যায়ে ২০০১ সালে একটি দাওয়াত অনুষ্ঠানে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। ওই অনুষ্ঠানে বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা জামায়াতের সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও তার স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। কিছুটা হাস্যরস করে মনিরুল হক বলছিলেন, ‘আমি বউ নিয়ে যাইনি, আরও কয়েকজনও যায়নি। কিন্তু তাহের ভাই (আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের) বউ নিয়ে গেছেন। ঢোকার পর দেখি, একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বলি, তাহের ভাই, ভাবি কোথায়? উনি বললেন, ‘এই যে!’ তখন বলি, ‘আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই, এটা কেমনে বুঝব?’ এ সময় সংসদ সদস্যদের অনেকেই উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন।
এরপর সংসদের নারী সদস্যদের নিয়ে কথা বলেছেন মনিরুল হক। তার মতে, ‘দুইজনের বক্তৃতা শুনেছি। আগামীতে কিছু করতে পারবে, ভবিষ্যৎ আছে, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো, কারা আপনারা?’ এরপর বিএনপির নারী সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের নারী সদস্যদের দিকে হাত দেখিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আপনারা এদিকে দেখতে পারেন; আমরা ওই দিকে দেখলে কী আছে বুঝব না, এটা ঠিক না।’ এই বক্তব্যে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। এতে সংসদে হট্টগোল শুরু হয়।
সমালোচনার মুখে একপর্যায়ে মনিরুল হক চৌধুরী দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, তার বক্তব্যের কোনো অংশে কারও আত্মসম্মানে আঘাত লেগে থাকলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একপর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বক্তব্যের আপত্তিকর অংশ সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ) করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মন্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সংসদ সদস্যদের নিজেদের মর্যাদা ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে।
এরপর আবার বক্তব্য শুরু করেন বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে মন্তব্য করলে সংসদে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়। এ অবস্থায় একপর্যায়ে আসরের নামাজের বিরতি ঘোষণা করেন ডেপুটি স্পিকার।
বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বিএনপির সংসদ সদস্যদের বক্তব্য সংসদীয় রীতিনীতি, সাংবিধানিক অধিকার—সবকিছুর সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি (মনিরুল হক) বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সেটা সংসদে এনে যেভাবে কটাক্ষ করা হলো, তা অমার্জনীয় অপরাধ। প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় ও পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে।’
এদিকে ভারত সীমান্তে অবৈধ ‘পুশইন’ ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে সংসদে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত হওয়ায় সমালোচনা করেছেন জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। গত বৃহস্পতিবার দিনের অধিবেশন মুলতবি হওয়ার পর প্রকাশিত রবিবার কার্যসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে রবিবার সকালে প্রকাশিত সংশোধিত কার্যসূচিতে বিষয়টি আর রাখা হয়নি।
আলোচনার প্রস্তাবের নোটিসের বিষয়টি তুলে ধরে অধিবেশনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আহমাদ বিন কাসেম বলেছেন, ‘আমার প্রশ্ন, জনগণের রক্তের চেয়ে আর কী গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে যে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, যা কোনো দলীয় এজেন্ডা নয়, তা অনিবার্য কারণ দেখিয়ে স্থগিত করতে হলো? দ্বিতীয়ত, যেহেতু এটি স্থগিত করা হয়েছে, তাহলে কবে এটি আলোচনার জন্য পুনর্নির্ধারণ করা হবে?’
জবাবে ডেপুটি স্পিকার বলেছেন, ‘নোটিসটি আমার সামনেও আছে। স্থগিতাদেশ একটি সাময়িক ব্যবস্থা। বর্তমানে বাজেট অধিবেশন চলছে এবং সময়ের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আশা করছি, স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর সুবিধাজনক সময়ে এ নোটিসের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।’
অন্যদিকে অধিবেশনের শুরুতেই ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে ৩০ দিনের মধ্যে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বললেন, ‘এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।’




