প্রমত্তা পদ্মায় যত দুর্ঘটনা, লাশের মিছিল

পদ্মায় বিভিন্ন সময় ডুবে যাওয়া যান
প্রমত্তা পদ্মা— যার রূপ আর যৌবনে মুগ্ধ হন কবি, সেই পদ্মাই আজ এক অতলান্ত হাহাকারের নাম। ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে আজ কেবল রুপালি ইলিশের ঝিলিক নেই; মিশে আছে প্রিয়জন হারানো হাজারও মানুষের আর্তনাদ। একদিন আগে দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবি যেন এক দশক আগের ‘পিনাক-৬’ ট্র্যাজেডির ক্ষত নতুন করে জাগিয়ে দিলো।
পদ্মার গ্রাসে বারবার হারিয়ে যাওয়া এসব প্রাণ যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে— এই নদী যতটা রূপবতী, তার চেয়েও সহস্রগুণ বেশি ভয়ংকর তার রুদ্রমূর্তি। খরস্রোতা পদ্মায় ঘটে যাওয়া এমন কিছু প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক :
পিনাক-৬ লঞ্চডুবি
২০১৪ সালের ৪ আগস্ট। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে মাওয়া ঘাটের কাছে পদ্মা নদীতে ডুবে যায় লঞ্চ ‘পিনাক-৬’। আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি শরীয়তপুরের কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া ঘাটে আসছিল। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং নদীতে প্রবল স্রোত থাকার কারণে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হয়। ১৯৯১ সালের এই লঞ্চটি কেবল শান্ত পানিতে চলাচলের জন্য সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের সনদপ্রাপ্ত ছিল।
লঞ্চটি ডুবতে শুরু করলে আশপাশের নৌযানগুলো তাৎক্ষণিক উদ্ধারে এগিয়ে আসে। এতে প্রায় ১২০ জন যাত্রীর প্রাণরক্ষা হলেও অন্তত ৪৯ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, পুলিশ, র্যাব এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
এমভি মোস্তফা লঞ্চডুবি
২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে ডুবে যায় ‘এমভি মোস্তফা’ নামক লঞ্চটি। এটি পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে যাচ্ছিল। ঘাট ছেড়ে যাওয়ার মাত্র ১৫ মিনিট পর পাটুরিয়া থেকে প্রায় ৮০০ গজ দূরে ‘নার্গিস-১’ নামের একটি সারবাহী কার্গো জাহাজ লঞ্চটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে মুহূর্তেই লঞ্চটি উল্টে গিয়ে তলিয়ে যায়।
দুর্ঘটনার সাথে সাথেই ডেকের ওপর থাকা ৫০-৬০ জন যাত্রী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন রক্ষা করেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। এ ঘটনায় মোট ৭০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ২৭ জন পুরুষ, ২৪ জন নারী এবং ১৯ জন শিশু ছিল।
স্পিডবোট ও বাল্কহেড সংঘর্ষ
২০২১ সালের ৩ মে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাংলাবাজার ফেরিঘাটের কাছে এক ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ৩২ জন যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট বাংলাবাজারের দিকে যাচ্ছিল। ঘাটের কাছে নোঙর করা একটি বালুভর্তি বাল্কহেডের পেছনে স্পিডবোটটি সজোরে ধাক্কা দিলে তা মুহূর্তেই ধুমড়েমুচড়ে পানির নিচে চলে যায়। এ ঘটনায় ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারান।
আমানত শাহ ফেরি ডুবি
২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় শাহ আমানত নামের একটি রো-রো ফেরি ১৭টি ট্রাকসহ আংশিক ডুবে যায়। ফেরিটি দৌলতদিয়া থেকে যানবাহন নিয়ে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে নোঙর করার পর আনলোড শুরু করতেই এক পাশে কাত হয়ে তলিয়ে যেতে থাকে। সৌভাগ্যবশত অধিকাংশ যাত্রী ও শ্রমিক সাঁতরে তীরে ওঠায় বড় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ত্রুটিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ এবং অতিরিক্ত ওজনের কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল।
দৌলতদিয়ায় বাসডুবি
একদিন আগে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৩ নম্বর পন্টুনে ফেরিতে ওঠার সময় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পদ্মায় পড়ে যায়। বাসটি মুহূর্তেই প্রায় ৩০ ফুট গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। কুষ্টিয়া থেকে আসা বাসটিতে যাত্রীসংখ্যা ছিল ৪০ জনেরও বেশি।
ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশের দীর্ঘ ৬ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানে বাসটি টেনে তোলা সম্ভব হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১১ জন নারী ও ৮ জন শিশু। জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৮ জনকে।

