বীরকন্যার মৃত্যুবার্ষিকী আজ
প্রীতিলতার মায়ের হাতে জন্ম ৩ গুণীর

“প্রীতির বিএ পরীক্ষার আগে ওর বাবার (জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার) চাকরি যায়। ফলে প্রীতির আয়ের ওপরই নির্ভর করে চলতে হতো তাদের। মা, বাবা আর চার ভাইবোন। সে নন্দনকানন হাইস্কুলে মাস্টারি করত। মেয়ের শোকে বাবা পাগলের মতো হয়ে গেলেন। কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন, ‘আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে।’ তাদের দুঃখের পরিসীমা ছিল না। ধাত্রীর কাজ নিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে নিয়েছেন।”
বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মৃত্যুর পর পরিবারটির দুর্দশার এমন চিত্র উঠে আসে সহযোদ্ধা বিপ্লবী কল্পনা দত্তের স্মৃতিকথায়। প্রীতির মা প্রতিভা দেবী ধাত্রীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তার হাতে জন্ম হয় পরবর্তী সময়ে নিজ কর্মে খ্যাতিমান তিনজনের। তাদের একজন সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন। অন্য দুজন হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মঞ্জুর ও তার বোন শিক্ষাবিদ মমতাজ জাহান লতিফ। শেষ দুজন শিক্ষাবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবুল ফজলের সন্তান।
প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে, পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। অপারেশনে ইংরেজ পুলিশের গুলিতে আহত হন। ধরা পড়ার ভয়ে সায়ানাইড পান করে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন প্রীতি।
প্রীতিলতার সহপাঠী বিপ্লবী কল্পনা দত্তেরও ইউরোপিয়ান ক্লাব অপারেশনে থাকার কথা ছিল। প্রীতির দুই বছরের জুনিয়র কল্পনা। দুজনই ডা. খাস্তগীর স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। স্কুলের উষা দিদিমণির কাছ থেকে ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মী বাঈয়ের বই পড়ে বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তারা। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের আগে কাট্টলীর সমুদ্র উপকূলে প্রীতিসহ টার্গেটিং প্রশিক্ষণ নেন তারা। পরে আগের রাতে প্রীতি জোর করে কল্পনাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’ বইয়ে কল্পনা দত্ত উল্লেখ করেছেন, ‘১৭ সেপ্টেম্বর রাতে প্রীতিদের আস্তানায় যাওয়ার সময় ধরা পড়ি। ধরা পড়ে প্রীতির ওপর রাগ হয়। ও জোর করলে হয়তো থাকতেও পারতাম। আজ ধরা পড়তে হতো না। এর সাত দিন পরই প্রীতি মারা যায়।’
প্রীতিলতারা তখন আসকারদীঘির পাড়ে থাকতেন। মৃত্যুর পর ওই বাড়িতে পুলিশি হয়রানি বেড়ে যায়। বাড়িটি আজও আছে। ‘প্রীতি ভিলা’ নামে পরিচিত এটি। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার পরিবার বাড়ি বদল করে ভারতে চলে যায়। বাড়িটির বর্তমান বাসিন্দারা পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের বাড়ি জগদ্বন্ধুকে ছেড়ে দেন। প্রীতি মারা যাওয়ার পর ওই বাড়িতে থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ধাত্রীর কাজ করতেন প্রতিভা দেবী।
প্রীতিলতার মায়ের হাতে জন্ম নেওয়া ড. অনুপম সেনের বয়স এখন ৮৬ বছর। দুই বছর আগে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে ইস্তফা দিয়ে এখন অবসর জীবনযাপন করছেন তিনি। অনুপম সেনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বসার ঘরের যে চেয়ারে তিনি বসেন, তার পাশের দেয়ালে ঝুলছে প্রীতিলতার ছবি।
নিজের জন্মের কথা বলতে গিয়ে যেন গর্বে বুক ফুলে ওঠে অনুপম সেনের, ‘আমাদের বাসা ছিল আইস ফ্যাক্টরি সড়কে। ওই বাড়িতে প্রীতিলতার মায়ের হাতে আমার জন্ম ১৯৪০ সালের ৫ আগস্ট। আমার বন্ধু আবুল মঞ্জুরের জন্মও একই বছর উনার হাতে।’
আবুল মঞ্জুরের জন্ম ১৯৪০ সালের ১৭ মার্চ কাজীর দেউড়ির নিজ বাড়ি ‘সাহিত্য নিকেতন’-এ। একই বাড়িতে ১৯৪৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন আবুল মঞ্জুরের বোন ও লেখিকা মমতাজ জাহান।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুদ্ধ প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন আবুল মঞ্জুর। মঞ্জুর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। বোন মমতাজ প্রথমদিকে কলেজশিক্ষক ছিলেন। পরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
তাদের ভাই একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেছেন, ‘মঞ্জুর ভাই ও বোন মমতাজ জাহানের জন্ম হয় প্রীতিলতার মায়ের হাতে, আমাদের কাজীর দেউড়ির বাড়িতে। আসকারদীঘির পাড়ের মাটির বাড়িতে তখন প্রীতিলতার পরিবার থাকত।’
আরেক বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রীতির বাবা মৃত্যুর আগপর্যন্ত গৃহশিক্ষকতা করে জীবিকা নির্বাহ করে গেছেন। তার মা সংসার চালানোর জন্য বাধ্য হয়ে পারিবারিক আভিজাত্য ও বিধিনিষেধকে অবহেলা করে ধাত্রীর কাজ শিখে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছেন। তিনি কয়েক বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের শ্রেষ্ঠ ধাত্রী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।’
মায়ের প্রতি প্রীতিলতার ছিল অসম্ভব ভালোবাসা। মৃত্যুর আগে অজ্ঞাতবাস থেকে এক চিঠিতে প্রীতিলতা মাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, “মাগো, আমায় তুমি ক্ষমা করো— আমি স্বদেশ-জননীর চোখের জল মোছবার জন্য বুকের রক্ত দিতে এসেছি। তুমি আমায় আশীর্বাদ করো। তোমার কথা আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলিনি মা। মাগো, আমি শুনেছি, তুমি ঘরের দরজায় বসে সবাইকে ডেকে ডেকে বলছো— ‘ওগো তোমরা আমার রানিশূন্য রাজ্য দেখে যাও।’ মাগো, তুমি অমন করে কেঁদো না। দেশ যে পরাধীন। দেশবাসী যে বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত। তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না?”



