আগামীর সময়

প্রতিদিন গড়ে ৭৫ আগুন, আবাসিক ভবনেই বেশি ঝুঁকি

নিহত ৮৫, আহত ২৬৭; বৈদ্যুতিক গোলযোগে সর্বাধিক অগ্নিকাণ্ড
প্রতিদিন গড়ে ৭৫ আগুন, আবাসিক ভবনেই বেশি ঝুঁকি

ফাইল ছবি

সারা দেশে ২০২৫ সালে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দিনে গড়ে প্রায় ৭৫টি। এসব ঘটনায় ৮৫ জন নিহত এবং ২৬৭ জন আহত হয়েছেন। ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। মোট ঘটনার ৩২ দশমিক ১৭ শতাংশই ঘটেছে আবাসিক ভবনে। মঙ্গলবার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন বলছে, আগুন লাগার প্রধান কারণ বৈদ্যুতিক গোলযোগ। মোট ঘটনার ৯ হাজার ৩৯২টি, অর্থাৎ ৩৪ শতাংশের বেশি আগুনের উৎস ছিল বিদ্যুৎ সংক্রান্ত ত্রুটি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২৬৯টি আগুন লেগেছে বিড়ি বা সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে, যা মোটের ১৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চুলা থেকে আগুনের ঘটনা দুই হাজার ৯০৯টি, প্রায় ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

গ্যাস সিলিন্ডার ও সরবরাহ লাইনের লিকেজ এবং বিস্ফোরণ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। শিশুদের আগুন নিয়ে খেলা, উত্তপ্ত ছাই, কয়েল ও আতশবাজি থেকেও শত শত ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে বাসাবাড়ি। আট হাজার ৭০৫টি আগুন লেগেছে আবাসিক ভবনে। খড়ের গাদায় আগুনের ঘটনা তিন হাজার ৯২২টি। বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে দোকানে এক হাজার ৮০০টি, হাটবাজারে এক হাজার ৬৭টি এবং শপিং মলে ৬১৭টি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। শিল্প খাতে পোশাক কারখানায় ৬৬৫টি এবং অন্যান্য কলকারখানায় ৬১৫টি আগুনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

ছয়তলার ওপরে বহুতল ভবনে আগুনের ঘটনা ছিল ৭১টি। সংখ্যা কম হলেও এসব ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেশি বলে ধরা হয়।

পরিবহন খাতেও আগুনের ঘটনা কম নয়। বাসে ১৫৩টি, অন্যান্য যানবাহনে ২১৬টি, ট্রেনে ১০টি, লঞ্চে চারটি এবং জাহাজে দুটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আগুন লাগার ঘটনাও বড় ধরনের হতাহতের কারণ হয়েছে।

মাসভিত্তিক হিসাবে মার্চে সবচেয়ে বেশি তিন হাজার ৫২২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল, জানুয়ারি ও ডিসেম্বরেও তুলনামূলক বেশি আগুনের ঘটনা ছিল। এসব সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১২৩টি আগুন লেগেছে, যা সারা বছরের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।

হতাহতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। নিহত ৮৫ জনের মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ ও ৩৯ জন নারী। আহত ২৬৭ জনের মধ্যে ১৯৭ জন পুরুষ এবং ৭০ জন নারী। বাসাবাড়িতে আগুনে ২২ জন নিহত ও ৭৭ জন আহত হয়েছেন। রাসায়নিক দুর্ঘটনায় নিহত ১৮ জন। ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনাজনিত আগুনে ৩৫ জন নিহত এবং ১১৬ জন আহত হয়।

অগ্নিকাণ্ডে আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। তবে দ্রুত পদক্ষেপে তিন হাজার ২৬৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। আগুন নেভাতে গিয়ে সংস্থাটির তিন সদস্য নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন।

অগ্নিনিরাপত্তা মূল্যায়নে ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে তিন হাজার ৩১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ছয় হাজার ৫৯৫টি ভবনকে সন্তোষজনক বলা হয়েছে। ১৯২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা এবং আটটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

প্রতিবছরের মতো সচেতনতা বাড়াতে নানা কর্মসূচিও চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ১৫ হাজার ৮৬৫টি মহড়া, তিন হাজার ৭২২টি ফায়ার ড্রিল, দুই হাজার ৭৮টি সার্ভে এবং ১৪ হাজার ৯৮৭টি গণসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। চার হাজার ৩৪৫টি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এক লাখ ৭৩ হাজার ৮০০ জনকে মৌলিক অগ্নিনিরাপত্তা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। পোশাকশিল্পে তিন হাজার ৯২১টি কোর্সে এক লাখ ৫৬ হাজার ৮৪০ জন শ্রমিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। পাশাপাশি নতুন ও পুরনো মিলিয়ে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

    শেয়ার করুন: