চট্টগ্রাম সিটিতে মশা নিধনের বাজেট বেড়েছে পাঁচ গুণ
- ডেঙ্গুঝুঁকিতে ৮ ওয়ার্ড

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) মশকনিধন খাতে এক বছরেই বাজেট বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। কেনা হয়েছে নতুন যন্ত্রপাতি, বাড়ানো হয়েছে জনবল। কিন্তু নগরে মশার দাপট কমেইনি, উল্টো ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এরই মধ্যে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে আটটিকে ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ বা অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের পর বছর অকার্যকর ওষুধ ছিটানো, মশার প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন এবং সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
তারা বলছেন, সনাতনী পদ্ধতি বাদ দিয়ে সিঙ্গাপুরের মতো ড্রোন দিয়ে উঁচু ভবনের ছাদে পানি জমার স্থান চিহ্নিত করা এবং ব্রাজিলের মতো ‘ওলবাকিয়া’ ব্যাকটেরিয়াবাহী মশা অবমুক্ত করার মতো আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জৈবিক প্রযুক্তির দিকে হাঁটতে হবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে।
ডেঙ্গুর হটস্পট আট ওয়ার্ড: বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, নগরের আটটি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এগুলো হলো— ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা এবং ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫৫। এর মধ্যে নগরে ৬২০ জন এবং উপজেলাগুলোয় ৬১৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত মারা যাওয়া তিনজনই নগরের বাইরে। শুধু আগস্টের প্রথম ১৮ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬২১ জন। উপজেলার মধ্যে সীতাকুণ্ড (১৫৮ জন) ও কর্ণফুলীতে (১১৪ জন) ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
সরেজমিনে গিয়ে নগরের আন্দরকিল্লা, পাঁচলাইশ ও বাকলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, নালা-নর্দমায় পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য আটকে পানি জমে আছে। সিডিএ ও ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে খালের সংযোগস্থলে জমে থাকা এসব পানি এডিস মশার নিরাপদ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
২৫ বছরে ব্যয় ৪১ কোটি, এবার রেকর্ড বাজেট: চসিকের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মশা নিয়ন্ত্রণে গত ২৫ বছরে ৪১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমলে ১২ কোটি ৪০ লাখ, এম মনজুর আলমের আমলে ৯ কোটি ৫০ লাখ, আ জ ম নাছির উদ্দীনের আমলে ৮ কোটি ৩০ লাখ এবং রেজাউল করিম চৌধুরীর চার বছরে ৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়।
চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মশক নিধন খাতে রেকর্ড ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ। বর্তমানে নগরে ১৬৫ জন নিয়মিত এবং বিশেষ টিমের ৬০ জন স্প্রেম্যান কাজ করছেন। তাদের হাতে রয়েছে ৭৪টি ফগার ও ১৬০টির বেশি স্প্রে মেশিন। এত আয়োজনের পরও মশা না কমায় ক্ষুব্ধ নগরবাসী।
ওষুধে মরে না মশা, প্রমাণ গবেষণায়: নগরে ছিটানো মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বয়ে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির এক প্রতিবেদনে ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। ২০২১ সালের ওই গবেষণায় দেখা যায়, চসিকের সরবরাহ করা লার্ভিসাইড (পানিতে ছিটানো ওষুধ) প্রয়োগের দুই ঘণ্টা পর মাত্র ১৬ শতাংশ মশা মারা যায়। আর ফগার মেশিন দিয়ে অ্যাডাল্টিসাইড (উড়ন্ত মশা মারার ওষুধ) ছিটানোর পর মশা মৃত্যুর হার ছিল ২০ শতাংশের নিচে।
টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ড. রবিউল হাসান ভূঁইয়া ও সদস্য সচিব ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক তাদের সুপারিশে জানিয়েছেন, রাসায়নিক ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নালা-নর্দমায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প হিসেবে মাছ চাষের মাধ্যমে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে মশা ওষুধপ্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্ট) হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের তাগিদ দেন তারা।
মেয়রের দাবি ও বিশেষজ্ঞদের মত: মশকনিধন কার্যক্রম নিয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা সম্ভাব্য সবধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। তবে এডিস মশা মূলত বাসাবাড়িতে বেশি জন্মায়। তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া এবং ব্যক্তিগত সচেতনতাই এ সমস্যা সমাধানের প্রধান পথ। আমরা আইইডিসিআর থেকে শতভাগ কার্যকর প্রমাণিত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিটিআই ব্যবহার করছি। ওয়ার্ড পর্যায়ে কারও গাফিলতি পেলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
তবে শুধু নাগরিকদের সচেতনতার ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই বলে মনে করেন পতঙ্গবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এক গবেষক বলেছেন, ‘ল্যাব টেস্ট ছাড়া বছরের পর বছর একই রাসায়নিক ব্যবহার করায় মশা প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে। শুধু বর্ষায় ফগিং করে মশা মারা যাবে না। চসিক, সিডিএ ও ওয়াসার কাজের সমন্বয়হীনতায় যেসব কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, আগে সেগুলো বন্ধ করতে হবে।’






