বিদেশি বিনিয়োগের সড়কে বেড়েছে মৃত্যু

ছবিঃ আগামীর সময়
প্রতিটি যাত্রাই যেন অনিশ্চয়তার নাম। তা আনন্দযাত্রা হোক বা নিত্যযাত্রা। ফুরোয় না প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর অপেক্ষা। সবকিছু থেমে যাচ্ছে জাতীয় মহাসড়কের বুকে। পরিসংখ্যানের দারিদ্র্যের মধ্যেও ফুটে উঠছে মহাসড়কগুলোর মৃত্যুফাঁদ। একাধিক সংস্থা নেমেছে গবেষণা-বিশ্লেষণে। আছে সরকারের তথ্য-উপাত্তও। এদের মধ্যে অন্যতম রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির ২০২১ সালের সঙ্গে ২০২৫ সালের প্রতিবেদন তুলনা করে দেখা যাচ্ছে এ সময়ের মধ্যে মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহাসড়কে বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অবকাঠামোগত ত্রুটিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দীর্ঘদিন ধরেই এসব সমস্যা চিহ্নিত। তবুও রয়ে গেছে কার্যকর উদ্যোগের অভাব। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে— এমনটাই তাদের মত। মূলত সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আইন প্রয়োগে জোর দেওয়া এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই থামাতে হবে এই মৃত্যু-কাফেলা।
দেশের পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ডের (আইএমএফ) নেতিবাচক মনোভাব পরিসংখ্যানে। তাদের চোখে ‘কিছু খামতি’ রয়েছে। পরিসংখ্যানে উঠে আসে না পুরো চিত্র। এর বাইরে নয় সড়ক দুর্ঘটনাও। পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়— প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি করে জীবন, পরিবার আর অসংখ্য স্বপ্ন; যা প্রতিদিন ভেঙে দিচ্ছে অনিরাপদ মহাসড়ক।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২১ এবং ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছে আগামীর সময়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১ সালে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ৩৭১টি এবং ২০২৫ সালে ঘটেছে সাত হাজার ৫৮৪টি।
২০২১ সালে ঘটা দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ছয় হাজার ২৮৪ জন এবং ২০২৫ সালে মৃত্যু হয়েছে সাত হাজার ৩৫৯ জনের। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে ১৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত সাত হাজার ৪৬৮ জন এবং ২০২৫ সালে আহত ১৬ হাজার ৪৭৩ জন। অর্থাৎ আহত বেড়েছে প্রায় ১২০ শতাংশ।
জাতীয় মহাসড়ক কেন দুর্ঘটনার মহাকেন্দ্রে পরিণত হলো এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি মনে করছেন, দুর্ঘটনার সব ঝুঁকি বহাল রেখেই মহাসড়কে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গতি বাড়ানোর আয়োজন করা হয়েছে।
এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞের কথায়, মূল্যায়ন ছাড়া বিনিয়োগ করলে যা হওয়ার-তাই হচ্ছে। মহাসড়কে গতি বেড়েছে, কিন্তু চালকের প্রশিক্ষণ বাড়েনি। এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে, দুই লেন হচ্ছে চার লেন। পানির তলে, মাটির উপরে বিশাল বিশাল স্থাপনা হচ্ছে— কিন্তু এসবে চলার মতো উপযুক্ত যানবাহন আসছে কোথায়? উল্টো জাতীয় মহাসড়কে রিকশা চলছে।
‘অর্থাৎ দুর্ঘটনার জন্য সম্ভাব্য যত ধরনের ঝুঁকি থাকে সব বজায় রেখে মহাসড়কে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছি। ব্যবস্থাপনায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারিনি। তাই দুর্ঘটনা ও মৃত্যু কমছে না। উল্টো ঋণ করা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে মৃত্যু’, যোগ করেন এই গবেষক।
প্রতিবেদকের কথা হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তার দাবি, জাতীয় মহাসড়কে শৃঙ্খলা রাখতে প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগিতা। কেন্দ্রীয়ভাবে সারা দেশের জাতীয় মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
ওই কর্মকর্তা মনে করেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংযোগ সড়কে মনিটরিং বাড়াতে পারলে মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।’
সড়ক বিশ্লেষণকারী সরকারি বেসরকারি সংস্থা-সংগঠনগুলোর মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত ওজন বহন আর ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এরসঙ্গে যোগ হচ্ছে চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা এবং বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা। মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন, তরুণ-যুবাদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোও কারণ। জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা, না মানার প্রবণতা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয় তো সর্বজনবিদিত।
প্রাণহানির সঙ্গে সম্পদহানিও কম বড় নয়। ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি ২৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার মতো। তবে এই ক্ষতির পরিমাণও শতভাগ সঠিক নয়। কেননা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির কোনো সরকারি হিসাব দেওয়া হয় না। প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি। এই বিবেচনায় ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দেশের জিডিপির দেড় শতাংশের বেশি হতে পারে। সম্পদ ও প্রাণহানির সংখ্যা মনে আঁকে ভয়ের ছবি।
















