ফ্যামিলি কার্ড দরিদ্র কমাবে ৫ শতাংশ
- বিশ্বব্যাংক-আইএমএফকে বাংলাদেশের বার্তা
- প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে ‘ডিজিটাল কাঠামো’ ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছি -ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গত রবিবার শেষ হয়েছে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভা। যেটি বৈশ্বিক অর্থনীতির মেগা সম্মেলন। এতে যোগ দিয়েছিলেন ১৯১টি দেশের অর্থমন্ত্রীরা। সেখানে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ও ফ্যামিলি কার্ড। ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির চাপে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে— এমন শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশ বলেছে, ডিজিটাল কাঠামোয় চালু হওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে প্রায় ৫ শতাংশ মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব। এ নিয়ে একরকম সন্তোষ প্রকাশ করেছে উন্নয়ন সহযোগী দুই সংস্থাই।
ব্যাংককের কুইন সিরিকিত সম্মেলনকেন্দ্রে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ওই সভায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির কারণে গরিবের সংখ্যা আরও বাড়বে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে আসে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ফ্যামিলি কার্ড দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে পারলে এ কর্মসূচি শুধু চলমান মূল্যস্ফীতির চাপই কমাবে না; বরং ৮০ লাখ মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া থেকেও রক্ষা করবে।
এ প্রসঙ্গে কুইন সিরিকিত ইন্টারন্যাশনাল কনভেশন সেন্টারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল তিতুমীর বলেছেন, অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি। যাদের সহায়তা পাওয়ার কথা, তাদের অনেকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি। অন্যদিকে যাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নয়, তারাও তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকার ‘ডিজিটাল জনপরিকাঠামো’ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো যায়।
জানা গেছে, অতীতে সামাজিক সুরক্ষা খাতের বড় সমস্যা ছিল ভুয়া নাম অন্তর্ভুক্তি এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়া। কিন্তু এখন ডিজিটাল জনপরিকাঠামো (যেমন— স্মার্টকার্ড ও বায়োমেট্রিক সিস্টেম) ব্যবহারে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছাবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে দাতা সংস্থাগুলোকে।
এ ছাড়া ওই বৈঠকে আরও বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি ইত্যাদি খাদ্যপণ্য অথবা সরাসরি নগদ অর্থসহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের বড় অঙ্কের খরচ বেঁচে যাবে।
ফ্যামিলি কার্ড সুবিধা পাওয়া পরিবারগুলোর খাদ্য ও নিত্যপণ্যে খরচ কমবে। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের বেঁচে যাওয়া আয় অন্য জরুরি খাতে (যেমন শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কিংবা ছোটখাটো কুটিরশিল্প বা ব্যবস্যা) বিনিয়োগ করতে পারে।
পাশাপাশি পরিবারের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত হলে শিশুদের স্কুলে ঝরে পড়ার হার কমবে এবং মানবসম্পদের বিকাশ ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবারটিকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনতে পারবে।
দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক সংকটের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ। ফ্যামিলি কার্ড একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে কাজ করবে। এতে মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় নতুন করে কয়েক লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি সাময়িক কোনো ‘রিলিফ’ বা ত্রাণ বিতরণব্যবস্থা নয়; এটি দেশের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্বব্যাংকের মতে, আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি চরম গরিব মানুষ এখনো সরকারি কোনো সাহায্য বা ভাতা সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন। কিন্তু সরকারি সহায়তা যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা গেলে, সীমিত সম্পদ দিয়েই দারিদ্র্য অনেকখানি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বর্তমানে নানা ধরনের খাবারসহায়তা বা নগদ টাকা দেওয়ার যেসব আলাদা কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলোকে এক জায়গায় এনে সঠিকভাবে সঠিক মানুষের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দিতে পারলে বড়সংখ্যক মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, সরকার দেশে প্রথমবারের মতো সব পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী এর পাইলটিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন, যেখানে ৫৭টি ইউনিটে ১,১২,০৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে ৭১,৮৩১ জন যোগ্য নারীকে সরাসরি ভাতা দেওয়া হয়েছে। এরপর ১২ অক্টোবর থেকে ৬৬,৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারীর মাধ্যমে দেশব্যাপী বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের মূল কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ পরিবারের তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন ৪০ লাখ নারী পরিবারপ্রধানকে ভাতার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার জন্য মোট ১৪,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১২,৩০০ কোটি টাকা ভাতা। আগামী ৩ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাকি যোগ্য সব পরিবারকে এর আওতায় আনা হবে।



