ইউজিসির সদস্য হলেন ড. মামুন, নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
- নিয়োগের বিষয়ে জানেন না শিক্ষামন্ত্রী
- এক ঘণ্টার মধ্যেই যোগদান
- ক্ষুব্ধ ইউজিসি, ঢাবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। আজ শনিবার চার বছরের জন্য তাকে নিয়োগ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রফেসর মামুনকে এ পদে নিয়োগের পর থেকেই সমালোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাডি সেন্টার খুলে সনদ ব্যবসা, বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে প্রতারণা এবং জার্নালে জালিয়াতির মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্র বলছে, প্রফেসর মামুনের নিয়োগ হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর অগোচরে। অন্যদিকে তার নিয়োগ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ইউজিসির কর্তাব্যক্তিরাও। তবে এসব বিষয়কে পাত্তা দেননি প্রফেসর মামুন। প্রজ্ঞাপন জারির এক ঘণ্টার মধ্যে তড়িঘড়ি করে সেরেছেন যোগদান।
ঢাবির একজন শিক্ষক জানালেন, প্রফেসর মামুনকে ইউজিসির সদস্য করা হলো। অথচ খোদ ইউজিসিই তার জার্নাল জালিয়াতির তদন্ত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতিতে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
নিয়োগের বিষয়ে জানেন না শিক্ষামন্ত্রী
বিতর্কিত এই নিয়োগের ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ হ ম এহসানুল হক মিলন। তিনি স্পষ্ট করেন, ‘আমি দেশের বাইরে আছি। তিনি (প্রফেসর মামুন) কীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন তা আমার জানা নেই।’
প্রফেসর মামুনের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, ‘অভিযোগ থাকলে সেটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দেখবে। কারণ চূড়ান্ত নিয়োগ দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।’
প্রফেসর মামুনের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ উঠেছিল ২০১৫ সালে। সে সময় বিতর্কিত ‘বিএসি’ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তখন সরকারের অনুমোদন ছাড়াই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিগ্রি ও ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন (টিএনই) প্রোগ্রাম পরিচালনা শুরু করে সনদ বিক্রি করছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় ইউজিসি।
সে সময় সংস্থাটি বলেছিল, অনুমোদন ছাড়া কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা তাদের স্টাডি সেন্টার কার্যক্রম চালাতে পারবে না বাংলাদেশে। প্রফেসর মামুন সংশ্লিষ্ট এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। কিন্তু এর আগেই বিদেশি সনদ বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে প্রফেসর মামুন আগামী সময়কে বলেছেন, ‘আমি প্রতিষ্ঠানটি নিজে গড়িনি, উপদেষ্টা ছিলাম। সরকার যখন এটার অনুমোদন দেয়নি, তখন আমি সেখান থেকে বের হয়ে আসি।’
তবে তার বক্তব্যকে ‘অসত্য’ দাবি করেছেন ইউজিসির একজন পরিচালক। তিনি জানাচ্ছিলেন, ‘আমি যখন প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে তদন্ত করতে যাই, তখন প্রফেসর মামুনের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাই। যদিও সরকার সেটি বন্ধ করে দেয়। এখন প্রশ্ন হলো— একজন ঢাবি শিক্ষকের এমন অননুমোদিত সনদ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হওয়াটা কি নৈতিক স্খলন নয়? এখন তিনি খোদ ইউজিসির সদস্য। তার হাত ধরেই বিতর্কিত বিদেশি স্টাডি সেন্টার অনুমোদন পায় কিনা— সেই সংশয় দেখা দিয়েছে।’
অবৈধ ভূমি ব্যবসা
শুধু সনদ বাণিজ্যই নয়, পরিবেশ ধ্বংসকারী আবাসন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত থাকার অভিযোগ প্রফেসর মামুনের বিরুদ্ধে। নদী ভরাট করে গড়ে তোলা বিতর্কিত ‘মধুমতি হাউজিং প্রকল্পের’ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। নিজের পরিচয় দিতেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে।
জলাশয় এবং নদী ভরাট করে নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা ‘মধুমতি মডেল টাউন’ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদালতে রিট করেছিল পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা। এর প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে প্রকল্পটিকে অবৈধ ঘোষণা করে তা বন্ধ করে দেন আদালত।
উচ্চ আদালতের আদেশে নিষিদ্ধ ও দণ্ডপ্রাপ্ত আবাসন প্রকল্পে যুক্ত থাকা ব্যক্তি ইউজিসির সদস্য হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন সংস্থাটির আরেক সদস্য। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘তার (প্রফেসর মামুন) নিয়োগের প্রজ্ঞাপন দেখে আমরা হতভম্ব।’
বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা
বিদেশে পাঠানোর নামে শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতারণা করা প্রতিষ্ঠান বিএসবি ক্যামব্রিয়ান অ্যাডুকেশন গ্রুপের সঙ্গেও জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে প্রফেসর মামুনের বিরুদ্ধে। প্রতারণার শিকার একাধিক শিক্ষার্থীর করা মামলায় বর্তমানে কারাগারে বিএসবি ও ক্যামব্রিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান এম কে বাশার। তবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য অস্বীকার করেছেন প্রফেসর মামুন।
জার্নাল জালিয়াতি
ঢাবিতে পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ী করতে ভুয়া প্রকাশনার তারিখ ব্যবহার এবং জার্নালের মেটাডেটা জালিয়াতির অভিযোগ প্রফেসর মামুনের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে ২০২৫ সালের মার্চে ঢাবির তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বরাবর একাধিক প্রমাণাদিসহ লিখিত অভিযোগ জমা দেন একই বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান ড. জাহাঙ্গীর আলম।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানাচ্ছে, ঢাবিতে চাকরি স্থায়ী করতে প্রার্থীর পদোন্নতির ঠিক এক বছরের মধ্যে (প্রবেশন পিরিয়ড) ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার সংবলিত জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে হয়। ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পদোন্নতি পাওয়া প্রফেসর মামুন পরের বছরের ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রবন্ধ জমা দেওয়ার কথা থাকলেও ব্যর্থ হন। ২০২৩ সালের ২৯ মে স্থায়ীকরণ কমিটির সভায় প্রবন্ধ বিলম্বে প্রকাশিত হওয়ায় ঢাবির বিধি অনুযায়ী অপর দুই সহকর্মীর চেয়ে জুনিয়র বা কনিষ্ঠ করা হয় তাকে।
অভিযোগ আছে, জুনিয়র হওয়ার পরই প্রফেসর মামুন ‘জার্নাল অব গভর্ন্যান্স, সিকিউরিটি অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট’-এর এডিটরের সঙ্গে যোগসাজশে একটি প্রবন্ধের অনলাইন প্রকাশের তারিখ ব্যাকডেটে (১ জানুয়ারি ২০২৩) দেখান। কিন্তু মেটাডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই প্রবন্ধের ডিওআই'র জন্য তিনি আবেদনই করেছেন ওই বছরের ১ জুন। আর তাও চাকরি স্থায়ী হওয়ার সভার পর।
‘প্রফেসর মামুন সুস্পষ্টভাবে জার্নাল প্রকাশের তারিখ জালিয়াতি করেছেন’, বলছিলেন ঢাবির জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. জাহাঙ্গীর আলম।
তবে এই অভিযোগটি মিথ্যা দাবি করে প্রফেসর মামুন আগামীর সময়কে বলেন, ‘অভিযোগকারী একটি নিষিদ্ধ দলের সমর্থক। ডিওআই নম্বর কর্তৃপক্ষ কখন দেবে সেটা তাদের বিষয়, জানুয়ারিতেই পাবলিশ হয়েছে আমার আর্টিকেল।’
ক্ষমতার বদলে চরিত্র বদল
শিক্ষাজীবনে রংপুরে একটি ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রফেসর মামুন, যা তিনি বরাবরই এড়িয়ে গেছেন। তার সহকর্মীদের দাবি, এখনও সংগঠনটির মতাদর্শের সঙ্গে তিনি যুক্ত। তবে ২০২৪ সালে আগস্ট মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘এনসিপি’তে গিয়ে ভেড়েন প্রফেসর মামুন। তাদের সমর্থনে হন ঢাবির প্রভোস্ট কাউন্সিলের আহ্বায়ক।






