আইনমন্ত্রী
দ্রুত বিচার মামলায় আপিল জট, সমাধান খুঁজছে সরকার

সংগৃহীত ছবি
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার নিষ্পত্তি হলেও আপিল পর্যায়ে গিয়ে অনেক মামলা পড়ে দীর্ঘসূত্রতায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছে সরকার। ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী হলেও, নৃশংস অপরাধের বাস্তবতায় মানবিক বিবেচনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘ডেথ পেনাল্টি : আইন, মানবাধিকার ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব বলছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণেই আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। তবে যখন কোনো আট বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আলামত নষ্ট করার জন্য তার শরীর বিকৃত করা হয়। তখন সমাজের একজন সদস্য হিসেবে মনে প্রশ্ন জাগে— এ ধরনের অপরাধীর জন্য কী শাস্তি হওয়া উচিত। সামাজিক বাস্তবতা ও জনমতের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়।’
‘সাড়ে তিন বছর বা পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ওপর ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। সে সময় আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে নৈতিকতার প্রশ্ন অনেক ক্ষেত্রে পেছনে চলে যায়। এটাই আমাদের বাস্তবতা,’ বললেন তিনি।
রামিসা হত্যা মামলার প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী জানালেন, ঘটনার সাত ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল অভিযুক্তকে। ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কারণে কিছু জটিলতা তৈরি হলেও মামলাটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় পাঁচ দিনে।
তিনি বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে মামলাটির বিচার শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আইন অনুযায়ী অভিযুক্তের পক্ষে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবীও নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়ে সমালোচনা হলেও তিনি মনে করেন, প্রত্যেক অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।’
রামিসা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিল করবেন কি না, তা এখনো অনিশ্চিত বলে জানালেন আইনমন্ত্রী। পরিবারের পক্ষ থেকে আপিল না করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হলেও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করার স্বার্থে কারাগার থেকেই আপিল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হলেও আপিল পর্যায়ে গিয়ে মামলা দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। এ কারণে বিচারপ্রার্থীদের কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে বিলম্ব হয়। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সরকার বিভিন্ন বিকল্প ও কার্যকর সমাধানের উপায় খুঁজছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘অনেক সময় সরকার জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা থাকলেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
আইনমন্ত্রী জানাচ্ছিলেন, সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়েছে লিগ্যাল এইড কমিশনের কার্যক্রম। এ কাজে ব্র্যাকসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা সহযোগিতা করছে। মামলার আগে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মামলার জট কমাতে স্থানীয় আদালতগুলোকে দ্রুত সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশ মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশে সংঘটিত কিছু নৃশংস অপরাধের কারণে মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নটি মানবিক ও আইনি— উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই জটিল হয়ে ওঠে।’
অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘আপাতত ডেথ পেনাল্টি বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। ভবিষ্যতে দেশে সহিংসতার মাত্রা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, দ্য ডেথ পেনাল্টি প্রজেক্টের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-নির্বাহী পরিচালক সাউল লেহরফ্রয়েন্ড এবং প্রজেক্ট ম্যানেজার কনি পার্কার-ধিনাকারান উপস্থিত ছিলেন। তারা মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি, মানবাধিকার বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি, বিচারব্যবস্থার বাস্তবতা এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করেন।









