শামা ওবায়েদ
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের সরকারের পক্ষ থেকে স্যালুট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সরকারের পক্ষ থেকে স্যালুট জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা যে ত্যাগ ও অবদান রেখে চলেছেন, তার প্রকৃত মূল্যায়ন অনেক সময় দেশের মানুষ উপলব্ধি করতে পারে না। দেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তারা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।’
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদান’বিষয়ক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন। ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিজাব) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
শামা ওবায়েদ জানান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সফর এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সময় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কতটা শ্রদ্ধা ও আস্থা রয়েছে। তাদের অর্জন শুধু পেশাগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য গর্ব ও মর্যাদার বিষয়।
তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা যে ভূমিকা পালন করেন, আমরা অনেকেই তার গভীরতা উপলব্ধি করি না। তারা জীবনের চেয়েও বড় ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকেই তারা এই কঠিন কাজ করে যাচ্ছেন।’
শান্তিরক্ষীদের পরিবারের আত্মত্যাগের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘একজন বাবা, স্বামী বা ভাইকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠানো কোনো পরিবারের জন্য সহজ বিষয় নয়। তারা জানেন না, প্রিয়জন নিরাপদে ফিরে আসবেন কি না। তবুও দেশপ্রেমের কারণে পরিবারগুলো এই ত্যাগ স্বীকার করে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের স্যালুট জানাই। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের স্যালুট জানাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবসময় শান্তিরক্ষীদের কল্যাণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছে।’
ভবিষ্যতেও শান্তিরক্ষীদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তাদের যেকোনো যৌক্তিক দাবি ও প্রয়োজন সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।’
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমোডর (অব.) এম এম জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এয়ার কমোডর মোহাম্মদ মুশতাকুর রহমান (এলপিআর) বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সাফল্য শুধু সামরিক দক্ষতার কারণে নয়; মানবিকতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্বের সমন্বিত প্রতিফলনের কারণেও বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।
বক্তারা বলেছেন, সিয়েরা লিওনের পুনর্গঠনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবদান, হাইতিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসলিম নারী পুলিশ ইউনিট মোতায়েন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ অর্জন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ডিফেন্স জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেছেন, ‘শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শান্তিরক্ষীরা বিপুল অর্থ উপার্জন করেন। বাস্তবে জাতিসংঘ থেকে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেছেন, ‘১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশে পরিণত হয়েছে।’
তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বিশ্বের ৪৩টি দেশে ৬৩টিরও বেশি শান্তিরক্ষা মিশনে দুই লাখ ৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ৪ হাজার ২১২ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আত্মত্যাগের অনন্য নজির রেখে এ পর্যন্ত ১৭৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের এই আত্মদান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, জাতিসংঘ ঘোষিত চলতি বছরের প্রতিপাদ্য ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বৈশ্বিক সংঘাত, সহিংসতা ও অস্থিরতার এ সময়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, মানবিক উদ্যোগ ও আত্মত্যাগ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নতুন আশা তৈরি করছে।
ডিজাব সভাপতি আলমগীর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সংগঠনের সাবেক সভাপতি আবুল খায়ের ও মামুনূর রশীদ, সিনিয়র সদস্য মাসুদ করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অধ্যাপক ও গবেষক বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স সেকশনের প্রেস স্পেশালিস্ট মাহাদি আল হাসনাতসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার শেষে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আত্মোৎসর্গকারী বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের অবদান তুলে ধরা এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান বক্তারা।




