ভারতে গিয়েছিলেন সুস্থ হতে, ফিরছেন লাশ হয়ে
- কলকাতার হোটেলে আগুনে ৯ মৃত্যুর ৫ জনই বাংলাদেশি
- একই ভবনে একাধিক হোটেল, ছিল না জরুরি বহির্গমন পথ

আগুনে মা-বাবা ও ভাইকে হারিয়েছে আট বছরের দেবানীতা দত্ত পাখি
রাত তখন প্রায় পৌনে ২টা। ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের বহুতল ভবনের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আচমকাই আগুন লাগে। অধিকাংশ অতিথি গভীর ঘুমে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যায় ঘর, করিডর ও সিঁড়ি। বেরোনোর পথও কার্যত বন্ধ। দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ৯ জনের। আহত হয় আরও অন্তত ছয়জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজনই বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি শিশুও।
কলকাতার হোটেলে গত মঙ্গলবার রাতের এই আগুনে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে গতকাল বুধবার দিনভর বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য এলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিশ্চিত করা হিসাবে নিহতদের অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের রয়েছেন চারজন। চিকিৎসার জন্য ১৫ দিন আগে কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিল পরিবারটি। গতকালই দেশে ফেরার কথা ছিল তাদের।
কলকাতার পুলিশ ও দমকল কর্মকর্তারা জানালেন, রাত আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিট থেকে ২টার মধ্যে আগুন লাগে। পাঁচতলা ভবনটিতে একাধিক হোটেল চলছিল। দোতলায় আগুনের সূত্রপাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে হোটেলের সুইচ বোর্ড বা এসি থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। শর্টসার্কিট অথবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে গোলযোগ— দুই সম্ভাবনাই তদন্তের আওতায়। চূড়ান্ত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।
আগুন নেভাতে প্রথমে চারটি, পরে পাঁচটি দমকলের ইঞ্জিন কাজে নামে। পুলিশ, দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী একসঙ্গে উদ্ধারকাজ চালায়। প্রায় ৮০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তবে ঘন ধোঁয়ার কারণে ওপরের তলাগুলোয় পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত কঠিন।
হোটেলগুলোর বেঁচে ফেরা অতিথিদের অভিযোগ, আগুন লাগার পর হোটেলের ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। ফলে বিপদের খবর দ্রুত ছড়ায়নি। এ ছাড়া প্রধান সিঁড়ির কাছেই আগুন ছড়িয়ে পড়ায় নিচে নামার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। আবার লিফটের কাছেও গিয়ে দেখা যায় সেটি কাজ করছে না। আরও ভয়াবহ অভিযোগ, জরুরি পরিস্থিতিতে হোটেলের কোনো কর্মী তাদের পাশে ছিলেন না। এমনকি কেউ কেউ ভবনের ছাদ বা ওপরের তলায় উঠে যেতে বলেছেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার সিঁড়ি ছিল অত্যন্ত সরু এবং লোহার তৈরি। একসঙ্গে একাধিক মানুষের ওঠানামাও ছিল প্রায় অসম্ভব। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো ভবন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
একই ভবনে একাধিক হোটেল, নেই জরুরি বহির্গমন: আগুন লাগার পর ভবনটির কাঠামো নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র পাঁচ ফুটের মতো সরু প্রবেশপথ, দুই পাশে কলাপসিবল গেট এবং ভেতরে একাধিক হোটেল— এমন ব্যবস্থার কথা সামনে এসেছে। একই ভবনে ছয়টি হোটেলের বোর্ড দেখা গেছে। ভেতরে আবার ছোট ছোট ঘর, সরু করিডর এবং কোথাও খুপরির মতো কক্ষ। পাঁচতলা ভবনের সিঁড়িও ছিল সরু ও বাঁকানো। অভিযোগ, একসঙ্গে দুজনের চলাচলও কঠিন ছিল। কোনো যথাযথ ফায়ার এক্সিট ছিল না, বাইরে থেকে উদ্ধারের মতো বিকল্প সিঁড়িও ছিল না। অনেক ঘরে জানালাও ছিল না। ফলে আগুনের শিখার চেয়ে ধোঁয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী।
হতাহতের তথ্য নিয়ে দিনভর বিভ্রান্তি: বাংলাদেশি নিহতের সংখ্যা নিয়ে দিনের বিভিন্ন সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য সামনে এসেছে। কলকাতার কিছু স্থানীয় সূত্রে ও সংবাদমাধ্যমে ৮ জন, এমনকি প্রথমদিকে ৯ জনই বাংলাদেশি বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, ৯ মৃতের মধ্যে অন্তত ৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। বাকি মৃতদের পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ছিল। আহত ছয় বাংলাদেশি প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন বলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
নিহত পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৭), তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), তাদের দুই বছরের ছেলে স্বর্ণাশীষ দত্ত, দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪) এবং ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের দুই বছরের শিশু আহমেদ বাবু। দেবাশীষ ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল৯’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি এবং কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘আজকের আলো’র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। কলকাতা পুলিশের কর্তারা জানালেন, দেবাশীষ, তার স্ত্রী ও সন্তান ৩ আগস্ট চিকিৎসার জন্য ভারতে আসেন। তারা প্রথমে বেঙ্গালুরুতে ছিলেন এবং এক দিন আগেই কলকাতায় এসে আকরাম আলীর সঙ্গে হোটেলটিতে উঠেছিলেন। চিকিৎসার প্রয়োজনেই তারা কলকাতায় ছিলেন।
আগুনে হতাহতের এ ঘটনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘটনায় শোক প্রকাশ করে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
কলকাতার এই আগুনে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফেরানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, সবার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।
দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি দেবাশীষ দত্তের প্রাণ হারানোর ঘটনায় শোক জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসানের সই করা শোকবার্তায় নিহতদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। দেবাশীষের পরিবারের এমন অপূরণীয় ক্ষতির মুহূর্তে আজকের পত্রিকা তাদের পাশে থাকার কথাও জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি রোগীদের অন্যতম গন্তব্যস্থল ভারত। কলকাতাসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে চিকিৎসা নেন এই রোগীরা। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভিসা জটিলতা ও কড়াকড়ির কারণে ভারতে যাওয়া কিছুটা কমেছিল।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন দেবাশীষ: ‘বাবা কোথায় চলে গেলি, বাবা রে!... তুই একদিন জিনিস কিনবি বইলা থাকলি বাবা! আজ জিনিস নিয়া কি হবে বাবা! জিনিসের দরকার নাই তো... তোমারে পাইলাম না।’ বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মা স্বপ্না দত্ত। তবে এরপর আর কথা বলতে পারেননি তিনি, ছেলের শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। স্বপ্না দত্তের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার বাতাস। যে বাড়িটি একসময় হাসি-কান্না আর স্বপ্ন দিয়ে সাজানো ছিল, আজ সে বাড়িটিতে নেমে এসেছে অপূরণীয় শূন্যতা।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন দেবাশীষ দত্ত। তার ওপরই নির্ভর করে চলত পুরো পরিবার। বাবা দিলীপ দত্ত ও অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, সংসারের খরচ— সবকিছু সামলানোর পরও এলাকায় পরোপকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন দেবাশীষ।
বাড়িতে থাকা দেবাশীষের আট বছরের মেয়ে দেবানীতা দত্ত পাখি সৌভাগ্যবশত রক্ষা পেয়েছে। মা-বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে সে যায়নি, থেকে গিয়েছিল কুষ্টিয়ার বাড়িতে। শিশুটি এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না তার মা, বাবা ও ছোট ভাই চিরদিনের মতো গেছে হারিয়ে।
দেশে ফিরবে কথা ছিল, খবর এলো মৃত্যুর: ‘আজই বাবুর দেশে ফেরার কথা ছিল; কিন্তু দুপুরে কলকাতা থেকে খবর এলো বাবু আর বেঁচে নেই’— কথাগুলো বলছিলেন কলকাতার হোটেলে আগুনে নিহত আহম্মেদ বাবুর (৩৭) বড় ভাই মোহাম্মদ আলী। গতকাল বিকালে ঢাকার সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়নের বেগুনবাড়ি সিকদারপাড়া এলাকায় নিহত আহম্মেদ বাবুর বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের মাতম দেখা যায়। নিহত বাবু সিকদারপাড়া মহল্লার আদম আলীর ছেলে। তিনি আমিনবাজার বাসস্ট্যান্ডে শাহীন সুপার মার্কেটে কিউট কসমেটিকস নামে একটি দোকানের মালিক ছিলেন।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন কলকাতা প্রতিনিধি রুবাইয়া জেসমিন, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি কাজী সাইফুল এবং সাভার প্রতিনিধি লোটন আচার্য্য






