ফুলেল শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণে মঞ্চ-সারথি আতাউর রহমানকে শেষ বিদায়

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা
নাট্যব্যক্তিত্ব, নির্দেশক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক আতাউর রহমানকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে সেখানে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহীরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
সোমবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আতাউর রহমান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী শাহেদা রহমান, ছেলে শাশ্বত রহমান, মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
মঙ্গলবার বাদ যোহর মগবাজারে জানাজা শেষে বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে আতাউর রহমানের মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে শিল্পী, সংগঠক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শেষ শ্রদ্ধা জানান তাকে। পরে মরদেহ বনানী কবরস্থানে নেওয়া হয়। দাফন সম্পন্ন হয় সেখানেই।
আতাউর রহমানের মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, তার বাবার মনে একটি কষ্ট ছিল যে মানুষ হয়তো তাকে ভালোবাসে না। কিন্তু মৃত্যুর পর এত মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তিনি কতটা প্রিয় ছিলেন তাদের কাছে। তিনি সবাইকে একসঙ্গে থাকার আহ্বান জানান এই বলে যে, একে অপরের পাশে না থাকলে গভীর একাকিত্বে ভুগতে পারে মানুষ।
তার ভাষ্য, শেষ কয়েক মাস অসুস্থতার কারণে তার বাবা থিয়েটারের কাজ করতে পারেননি। মঞ্চকে খুব মিস করতেন তার বাবা।
নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে নতুন ধারা গড়ে ওঠে, আতাউর রহমান অন্যতম প্রধান সংগঠক ও শিল্পী ছিলেন সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের। তার মৃত্যুর সঙ্গে করেই অবসান হলো সহযাত্রার দীর্ঘদিনের একটি অধ্যায়ের।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক উল্লেখ করেন, ১৯৬০-এর দশক থেকেই বাংলা নাটককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে কাজ করেছেন আতাউর রহমান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক মঞ্চায়ন এবং বিশ্বনাট্যকে বাংলা মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
সাংস্কৃতিক সংগঠক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, আতাউর রহমান ছিলেন তার অগ্রজ বন্ধু। নাট্যচর্চা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তার অঙ্গীকার তাকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।
ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা মন্তব্য করেন, রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে আতাউর রহমানের গভীর কাজ বাংলা সংস্কৃতির জন্য এক মূল্যবান সম্পদ। তার মৃত্যু সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় এক ক্ষতি।
অভিনয়শিল্পী লাকী ইনাম জানান, তার প্রথম নির্দেশক ছিলেন আতাউর রহমান। তার কাছ থেকেই মঞ্চে অভিনয়ের প্রাথমিক শিক্ষা পেয়েছেন তিনি। সেই স্মৃতি আজও অমূল্য তার কাছে।
অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালামের মতে, স্পষ্টভাষী, শিল্পবোদ্ধা এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আতাউর রহমান। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন এক আলোকবর্তিকা।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, ছায়ানট, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ, পরিচালক গিল্ড, অভিনয়শিল্পী সংঘ, প্রাচ্যনাট, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, বটতলা নাট্যদল, দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ এবং বাংলাদেশ আবৃত্তিশিল্পী সংসদসহ অসংখ্য সংগঠন শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
বাংলাদেশের নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন আতাউর রহমান। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক সভাপতি এবং আন্তর্জাতিক থিয়েটার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
উল্লেখ্য, ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন আতাউর রহমান। মঞ্চনাট্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।







