মাকামের প্রতিবেদন
ছয় মাসে ছয় মাজারে হামলা

ছয় মাসে ছয় মাজারে হামলা
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (১ জানুয়ারি-৩০ জুন) বাংলাদেশে অন্তত ছয়টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে সুফি ঐতিহ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম-সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’। একই সময়ে একটি মাজারের ওরস পালনে পুলিশি বাধা, একটি ওরসে হামলার চেষ্টা এবং একটি হামলার গুজবের ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর আগে আরেকটি প্রতিবেদনে মাকাম দাবি করেছিল, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত ১৭ মাসে সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত হামলার ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছিল। এবার জানুয়ারি-জুন ২০২৬ পর্যন্ত হামলার তথ্য প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে তারা।
আজ বুধবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত ‘২০২৬ সালে (জানুয়ারি-জুন) বাংলাদেশে সংঘটিত মাজার হামলা’ শীর্ষক ষান্মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ে সংঘটিত ঘটনাগুলোর তথ্য সংবাদমাধ্যম, ভিডিও ফুটেজ, প্রশাসনিক তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে সংকলন করা হয়েছে।
মাকাম জানিয়েছে, এটি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন নয়; বরং ওই সময়ে সংঘটিত মাজার-সংক্রান্ত ঘটনাবলির একটি সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপনের প্রয়াস। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ বললেন, ‘মাজারে হামলা বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর আঘাতের শামিল।’ তিনি হামলার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্ত মাজার ও দরবারগুলোর পুনর্বাসন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম বাবার দরবার শরিফে। কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে একদল উত্তেজিত জনতা দরবারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলায় পীর শামীম নিহত হন এবং তার দুই অনুসারী গুরুতর আহত হন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এ ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরবর্তীতে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয় এবং তদন্তের ভিত্তিতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিলেটের বিশ্বনাথে হযরত ইব্রাহিম শাহ মাজারে ওরস উপলক্ষে বাউল গানের আসরে হামলা, ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ হামলা, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হযরত শাহ রউফ (রহ.) দরগাহে দুই দফা হামলা, বরিশালে হাবিব শাহের দরবারে কবরকে কেন্দ্র করে হামলা ও ভাঙচুর এবং চট্টগ্রামের রাউজানে হযরত শাহ মিয়া শাহ (রহ.) মাজারে জুতা ও গরুর মল নিক্ষেপ করে অপবিত্র করার ঘটনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর হাইকোর্ট মাজারে ওরস পালনে পুলিশি বাধা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হযরত কছিমউদ্দীন শাহ (রহ.) মাজারে হামলার চেষ্টা এবং শরীয়তপুরে হযরত শাহ সোলায়মান (রহ.) ওরফে লেংটা বাবার মাজারকে ঘিরে হামলার গুজবের ঘটনাও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মাকামের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হামলাগুলোর পেছনে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত, স্থানীয় বিরোধ, মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণের অজুহাত এবং মাজার-সংক্রান্ত সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মাকামের দাবি, অন্তত দুটি বড় ঘটনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি ঘটনায় খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। সেখানে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ ঘটনায় প্রশাসন ঘটনাস্থলে বা আশপাশে উপস্থিত থাকলেও হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে পরবর্তী সময়ে কিছু ঘটনায় মামলা দায়ের, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত মোট সাতজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।




