স্মরণে মোহাম্মদ রফি
পাখির গান কেড়ে নিতে মানা করেছিলেন যে শিল্পী

মোহাম্মদ রফি
মোহাম্মদ রফি। উপমহাদেশের সংগীতজগতের কিংবদন্তি। গানেরজগতের সবক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। শাস্ত্রীয়, কাওয়ালি, ভজন, গজল, উচ্চাঙ্গসংগীত, দেশাত্মবোধক গান, বিরহ-বিচ্ছেদের, প্রেম-ভালোবাসার- প্রায় সব ধরনের গানে ছিলেন সমান দক্ষ। গান গেয়েছেন বহু ভাষায়। হিন্দি, উর্দু, বাংলা, কোনকানি, ভোজপুরী, উড়িয়া, পাঞ্জাবি, মারাঠি, সিন্ধি, কানাড়া, গুজরাতি, তেলেগু, মাঘি, মৈথিলি, অহমিয়া ইত্যাদি ভাষায় গান গেয়েছেন। ইংরেজি, ফার্সি, স্প্যানিশ ও ডাচ ভাষায়ও গেয়েছেন অনেক গান।
‘না না না, পাখিটার বুকে যেন তীর মের না, ওকে গাইতে দাও...’ রফির ভরাট কণ্ঠে গাওয়া এ গান সংগীতপ্রেমীদের কাছে বিপুল আবেদন জাগায়। ‘গুলমোহরের ফুল ঝরে যায়,’ ‘তোমার নীল দোপাটি চোখ, শ্বেত দোপাটি হাসি’, ‘ওই দূর দিগন্তের পাড়ে’ এমন অসংখ্য বাংলা গান জনপ্রিয় হয়েছে মোহাম্মদ রফির কণ্ঠে। ক্লাসিক্যাল আর আধুনিক গানের সংমিশ্রণে গাওয়া ‘গুলমোহরের ফুল ঝরে যায়’ গানটি সংগীতপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আবেদন জাগায়।
মোহাম্মদ রফি ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর গ্রামের কাছে কোটলা সুলতান সিংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম ছিল ফিকো। নিজ গ্রামে এক ফকিরের ভোজন গানকে অনুকরণ করে রফির গানেরজগতে পথচলা শুরু। জীবিকার সন্ধানে বাবা হাজি আলী মোহাম্মদ ১৯২০ সালে লাহোর চলে যান। সেখানে তার বাবা ভাট্টি গেটের নূর মহল্লায় একটি সেলুন চালাতেন।
মোহাম্মদ রফির বড় ভাই মোহাম্মদ দ্বীন। লাহোরে অবস্থানকালে বড় ভাইয়ের বন্ধু আবদুল হামিদ রফির সংগীত প্রতিভা দেখে তার প্রতি আগ্রহী হন। তিনি পরিবারের সম্মতি নিয়ে মোহাম্মদ রফিকে মুম্বাই পাঠান। ১৯৪১ সালে শ্যাম সুন্দরের নির্দেশনায় লাহোরে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অভিষিক্ত হন। পাঞ্জাবি ভাষায় নির্মিত ‘গুল বালুচ’ চলচ্চিত্রে জিনাত বেগমের সঙ্গে দ্বৈতসংগীত ‘সোনিয়ে নি, হেরিয়ে নি’ গানে কণ্ঠ দেন। একই বছরে মোহাম্মদ রফি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে লাহোর সম্প্রচার কেন্দ্রে গান পরিবেশনের আমন্ত্রণ পান।
মোহাম্মদ রফি ১৯৪৪ সালে মুম্বাইতে চলে আসেন। তার শ্যালক আব্দুল হামিদ ভেন্দী বাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় দশ ফুট বাই দশ ফুট একটি কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করেন। আব্দুল হামিদ তাকে কবি আবদুর রশীদ কারদার, মেহবুব খান এবং অভিনেতা-পরিচালক নাজিরের পরিচয় করিয়ে দেন। শ্যাম সুন্দর তখন মুম্বাইয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি রফিকে আবারও জি এম দুররানীর সঙ্গে দ্বৈতসংগীতে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এ সময়ে মোহাম্মদ রফি উস্তাদ গোলাম আলী খান, উস্তাদ আব্দুল ওয়াহিদ খান, পণ্ডিত জীবনলাল মত্তো এবং ফিরোজ নিজামীর মতো প্রথিতযশা শিল্পীদের কাছে শাস্ত্রীয়সংগীতে তালিম নেন। ১৩ বছর বয়সে রফি লাহোরের প্রথিতযশা শিল্পী কে এল সাইগলের সঙ্গে প্রথম দর্শক-শ্রোতাদের মুখোমুখি হয়ে কনসার্টে পরিবেশন করেন।
ভারত ভাগের সময় মোহাম্মদ রফি স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। তার পরিবারও বোম্বেতে চলে আসে। রফি জনপ্রিয় সংগীতকার কুন্দন লাল সায়গল, তালাত মেহমুদের গানগুলো গভীরভাবে অনুসরণ করেন। তবে সবচেয়ে বেশি অনুরক্ত ও প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন জি এম দুররানির প্রতি।
মোহাম্মদ রফি তার সুদীর্ঘ সংগীতজীবনে অনেক নামকরা সংগীত পরিচালকের দিকনির্দেশনায় নানা ধরনের গান গেয়েছেন। এরমধ্যে অমর সংগীত পরিচালক নওশাদের পরিচালনায় গেয়েছেন বেশিসংখ্যক গান। এ ছাড়া মোহাম্মদ রফি ও পি নায়ার ৫০ ও ৬০-এর দশকে শঙ্কর জয়কিষাণ এবং এস ডি বর্মনের সুরেও অনেক গান গেয়েছেন।
ক্লাসিক্যালের পাশাপাশি সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন মোহাম্মদ রফি। প্রায় ছাব্বিশ হাজার চলচ্চিত্র গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। জনপ্রিয়তার সাথে চার দশক বিচরণ করেছেন সংগীতজগতে। শ্রেষ্ঠ গায়ক হিসেবে ভারতের জাতীয় পদক, ছয়বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে অভিষিক্ত হন পদ্মশ্রী সম্মানেও।
টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকা ২৪ জুলাই ২০১০ সংখ্যায় মোহাম্মদ রফি সম্পর্কে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে মোহাম্মদ রফি সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলা হয়েছে- আমি তোমাকে ভালোবাসি বা I love you বাক্যটি যদি ১০১ প্রকারে গাইতে বলা হলে একমাত্র মোহাম্মদ রফিই গাইতে পারবেন এবং প্রতিটিই হবে জনপ্রিয়।
মোহাম্মদ রফির জন্ম ১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পাঞ্জাবে। ১৯৮০ সালে তিনি মারা যান। আজ তার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী! মৃত্যুবার্ষিকীতে এই প্রিয় শিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর এবং পরিচালক, প্রশাসন, আগামীর সময়







